একতরফা ডিক্রী কি? মামলার শুনানির দিন উভয়পক্ষের কিংবা যে কোনো এক পক্ষের অনুপস্থিত থাকার ফলাফল কি? যে বিবাদীর বিরুদ্ধে একতরফা ডিক্রী দেওয়া হয়েছে কিংবা অনুপস্থিত থাকার কারণে যে বাদীর বিরুদ্ধে মামলা খারিজ হয়েছে তারা কি কি প্রতিকার লাভ করতে পারে? একটি পক্ষের অনুপস্থিতির জন্য সাধারণত কি কি কারণে হিসাবে গণ্য করা হয়?
একতরফা ডিক্রী কি? মামলার শুনানির
দিন উভয়পক্ষের কিংবা যে কোনো এক পক্ষের অনুপস্থিত থাকার ফলাফল কি? যে বিবাদীর বিরুদ্ধে
একতরফা ডিক্রী দেওয়া হয়েছে কিংবা অনুপস্থিত থাকার কারণে যে বাদীর বিরুদ্ধে মামলা
খারিজ হয়েছে তারা কি কি প্রতিকার লাভ করতে পারে? একটি পক্ষের অনুপস্থিতির জন্য সাধারণত
কি কি কারণে হিসাবে গণ্য করা হয়?
একতরফা ডিক্রী (Unilateral Decree) হলো দেওয়ানী কার্যবিধিতে একধরনের রায় যা আদালত একপক্ষের দাবি মেনে দিয়ে অন্য পক্ষের অংশগ্রহণ ছাড়াই দেয়।
সোজা
কথায়,
এটি
সেই
রায়
যা
মামলার একপক্ষ উপস্থিত থাকলেও, অপর পক্ষ অনুপস্থিত বা জবাব না দিলে আদালত একতরফা দেয়।
বৈশিষ্ট্য:
- একপক্ষীয়
রায় – শুধুমাত্র যে পক্ষ মামলাটি দায়ের করেছে তার দাবির ভিত্তিতে রায় দেওয়া হয়।
- অপর
পক্ষের অনুপস্থিতি বা অবহেলা – বিপক্ষ সময়মতো জবাব না দিলে বা আদালতে উপস্থিত না হলে একতরফা ডিক্রী হতে পারে।
- দায়িত্ব
ও প্রভাব – একতরফা ডিক্রী দেওয়া হলেও, বিপক্ষ সাধারণত আদালতে আবেদন করে পুনঃবিবেচনার সুযোগ পেতে পারে।
- আইনগত
ভিত্তি – দেওয়ানী কার্যবিধি অনুযায়ী, যদি বাদী (দাবিদার) তার দাবির প্রমাণ প্রদর্শন করে এবং বিপক্ষ অনুপস্থিত থাকে, আদালত একতরফা ডিক্রী জারি করতে পারে।
মামলার শুনানির দিন উভয়পক্ষের কিংবা
যে কোনো এক পক্ষের অনুপস্থিত থাকার ফলাফল কি?
মামলার
শুনানির দিন উভয়পক্ষের কিংবা যে কোনো এক
পক্ষের অনুপস্থিত থাকার ফলাফল কি? বিস্তারিত
ঠিক আছে, আমি বিষয়টি বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করছি, যাতে আদালতে শুনানির দিনে উভয়পক্ষের বা কোনো এক
পক্ষের অনুপস্থিতির ফলাফল পুরোপুরি বোঝা যায়।
উভয়পক্ষ অনুপস্থিত (Both Parties Absent)
·
পরিস্থিতি:
আদালত মামলার জন্য শুনানির দিন ধার্য করেছে, কিন্তু বাদী ও বিবাদী দুজনই উপস্থিত হয়নি।
·
ফলাফল:
1. আদালত সাধারণত মামলাটি স্থগিত (adjourned)
করে পুনঃশুনানির জন্য নতুন তারিখ নির্ধারণ করে।
2. মামলাটি নিজে থেকে খারিজ বা রায় দেওয়া হয় না, কারণ উভয় পক্ষই তাদের বক্তব্য দিতে পারেনি।
3. আদালত প্রয়োজনে উভয় পক্ষকে নতুন নোটিশ দিয়ে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেয়।
·
উদাহরণ:
o
আদালত
১৫ জানুয়ারি শুনানি নির্ধারণ করেছে। শুনানির দিন বাদী ও বিবাদী দুজনই
উপস্থিত হননি। → আদালত মামলা স্থগিত করে ১ ফেব্রুয়ারিতে পুনঃশুনানির
দিন ধার্য করে।
কেবল একজন পক্ষ অনুপস্থিত (One Party Absent)
(ক)
বাদী
অনুপস্থিত,
বিবাদী
উপস্থিত
·
পরিস্থিতি:
মামলার দিন বাদী উপস্থিত নয়, কিন্তু বিবাদী আদালতে হাজির।
·
ফলাফল:
1. আদালত সাধারণত মামলাটি স্থগিত (adjourn) করে নতুন তারিখ নির্ধারণ করে।
2. বাদীকে নোটিশ দেয় পুনরায় হাজির হয়ে মামলা পরিচালনার জন্য।
3. যদি বাদী দীর্ঘ সময় ধরে অনুপস্থিত থাকে, আদালত মামলাটি বাতিল বা খারিজ করতে পারে।
·
উদাহরণ:
o
বাদী
মামলার জন্য হাজির হয়নি, কিন্তু বিবাদী উপস্থিত। → আদালত মামলা স্থগিত করে বাদীকে হাজির হতে নোটিশ দেয়।
(খ)
বিবাদী
অনুপস্থিত,
বাদী
উপস্থিত
·
পরিস্থিতি:
মামলার দিন বাদী উপস্থিত, কিন্তু বিবাদী অনুপস্থিত।
·
ফলাফল:
1. আদালত বাদীর প্রমাণ এবং দাবি দেখে একতরফা ডিক্রী (Unilateral/Exparte
Decree) দিতে
পারে।
2. অর্থাৎ, বিবাদীর জবাব না থাকায় রায় একপক্ষীয়ভাবে গৃহীত হয়।
3. পরে বিবাদী চাইলে আদালতে আবেদন করতে পারে ডিক্রী রদ বা পুনঃবিবেচনার জন্য।
·
উদাহরণ:
o
বাদী
মামলায় উপস্থিত এবং প্রমাণ উপস্থাপন করেছে, কিন্তু বিবাদী অনুপস্থিত। → আদালত বাদীর পক্ষে একতরফা রায় দেয়।
যে
বিবাদীর বিরুদ্ধে একতরফা ডিক্রী দেওয়া হয়েছে কিংবা অনুপস্থিত থাকার কারণে যে বাদীর বিরুদ্ধে
মামলা খারিজ হয়েছে তারা কি কি প্রতিকার
লাভ করতে পারে?
১. একতরফা ডিক্রী (Exparte / Unilateral Decree)–এর বিরুদ্ধে প্রতিকার
পরিস্থিতি:
·
মামলা
চলাকালে বিবাদী অনুপস্থিত থাকে।
·
বাদী
উপস্থিত থেকে প্রমাণ দাখিল করে।
·
আদালত
একতরফা ডিক্রী দিয়ে বাদীর পক্ষে রায় দেয়।
বিবাদীর প্রতিকার (Legal Remedies):
1. ডিক্রী খারিজের আবেদন (Application to Set
Aside Exparte Decree)
o
আইনি
ভিত্তি: দেওয়ানী কার্যবিধি, ধারা 47 ও 148।
o
শর্ত:
§ বিবাদী যথাযথ কারণে অনুপস্থিত ছিল (যেমন অসুস্থতা, নোটিশ না পাওয়া, অনিচ্ছাকৃত
বাধা)।
§ আবেদন নিয়মিত সময়ের মধ্যে করতে হবে (সাধারণত ডিক্রীয়ের নোটিশ পাওয়ার পর 30 দিন)।
2. আদালতে পুনঃশুনানি (Hearing on
Merits)
o
যদি
আদালত বিবাদীর কারণ গ্রহণযোগ্য মনে করে, ডিক্রী বাতিল বা স্থগিত করে।
o
মামলায়
পুনঃশুনানি হয়, যেখানে বিবাদী তার যুক্তি, জবাব এবং প্রমাণ আদালতে উপস্থাপন করতে পারে।
3. সাবধানতার বিষয়:
o
শুধুমাত্র
অযথাযথ অনুপস্থিতি বা ভুলের জন্য
ডিক্রী বাতিল করা যায়।
o
ডিক্রী
খারিজের আবেদন বিচারের উপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে, কিন্তু প্রমাণ ও যুক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে
ডিক্রী
বাতিল
করে
না।
২. বাদীর অনুপস্থিতিতে মামলা খারিজ (Dismissal of Suit)–এর প্রতিকার
পরিস্থিতি:
·
বাদী
মামলায় অনুপস্থিত।
·
বিবাদী
উপস্থিত থাকে।
·
আদালত
বাদীর অনুপস্থিতির কারণে মামলা খারিজ করে।
বাদীর প্রতিকার (Legal Remedies):
1. মামলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা (Restoration
of Suit / Re-institution)
o
আইনি
ভিত্তি: দেওয়ানী কার্যবিধি, ধারা 47।
o
শর্ত:
§ বাদী অনুপস্থিত থাকার বৈধ কারণ প্রদর্শন করতে হবে (যেমন গুরুতর অসুস্থতা, দুর্ঘটনা, নোটিশ না পাওয়া)।
§ আবেদন যথাসময়ে করতে হবে।
2. পুনঃশুনানির সুযোগ (Opportunity for
Hearing)
o
যদি
আদালত আবেদন মঞ্জুর করে, মামলা পুনঃশুরু হয়।
o
বাদী
তখন যুক্তি ও প্রমাণ আদালতে উপস্থাপন করতে পারে।
3. সাবধানতার বিষয়:
o
অনুপস্থিত
থাকার কারণ নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা হয়।
o
আবেদন
না করলে মামলা স্থায়ীভাবে খারিজ হয়ে যায়।
এক পক্ষের অনুপস্থিতির জন্য সাধারণত যে কারণে আদালত
গ্রহণযোগ্য মনে করে
বাংলাদেশের সিভিল প্রসিডিউর কোড (CPC) অনুযায়ী, এক পক্ষের অনুপস্থিতি
যদি বৈধ কারণ থাকে, তবে আদালত একতরফা ডিক্রী দেওয়ার পরিবর্তে মামলাটিকে স্থগিত রাখতে পারে বা পরে হাজির
হতে অনুমতি দিতে পারে। এই বৈধ কারণগুলো
নিম্নরূপ:
১নোটিশ বা ডাক না
পৌঁছানো
·
বিবরণ:
যদি আদালতের নোটিশ, শুনানি তিথি বা মামলা সংক্রান্ত
ডাক সঠিকভাবে পক্ষের কাছে পৌঁছায় না।
·
আইনি
ভিত্তি:
সিভিল প্রসিডিউর কোডের ধারা অনুযায়ী, পক্ষের অবহেলার জন্য নয়, বরং নোটিশ না পৌঁছানোর কারণে
অনুপস্থিতি বৈধ।
·
উদাহরণ:
o
ডাক
ভুল ঠিকানায় পাঠানো হয়েছে।
o
ডাক
পৌঁছেছে, কিন্তু পক্ষ হাসপাতালে বা দূরবর্তী অঞ্চলে
থাকায় তা গ্রহণ করতে
পারেনি।
২ অসুস্থতা বা আঘাত
·
বিবরণ:
গুরুতর অসুস্থতা, হাসপাতালে ভর্তি বা চলাচলে অক্ষম
হওয়া।
·
প্রমাণ:
চিকিৎসা সনদ, হাসপাতালের রিপোর্ট বা ডাক্তারি নোট।
·
আইনি
প্রয়োগ:
আদালত সাধারণত এমন অনুপস্থিতি গ্রহণ করে এবং প্রয়োজনে মামলার শুনানি পুনরায় নির্ধারণ করে।
৩প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা দুর্ঘটনা
·
বিবরণ:
যেমন বন্যা, ভূমিধস, সড়ক দুর্ঘটনা বা অগ্নিকাণ্ড।
·
আইনি
দৃষ্টিকোণ:
এ ধরনের ঘটনা পক্ষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে ঘটে।
·
উদাহরণ:
গ্রামের রাস্তা ধ্বসে যাওয়ায় আদালতে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
৪ জরুরি সরকারি বা আইনগত বাধ্যবাধকতা
·
বিবরণ:
সরকারী দায়িত্ব, আদালতের বা পুলিশের উপস্থিতি,
নির্বাচনী বা জরুরি সরকারি
কার্যক্রম।
·
প্রমাণ:
সরকারি নোটিশ, দায়িত্ব-পত্র।
·
উদাহরণ:
সরকারি কর্মকর্তা মামলার দিন অফিসে বাধ্যতামূলক হাজিরার জন্য আদালতে উপস্থিত হতে পারছে না।
৫ প্রয়োজনীয় দলিল বা তথ্যের অনুপস্থিতি
·
বিবরণ:
মামলার জন্য অপরিহার্য দলিল না থাকা বা
পাওয়া বিলম্বিত হওয়া।
·
শর্ত:
আদালতে সময়মতো অবগত করা।
·
উদাহরণ:
প্রোপার্টি সংক্রান্ত মামলা, যেখানে মূল দলিল নথি অনুপস্থিত।
অগ্রহণযোগ্য
কারণসমূহ
·
ইচ্ছাকৃত
অবহেলা বা ভুলে আদালতে
না যাওয়া
·
অলসতা
বা অনীহা
·
কেবল
“ব্যস্ত ছিলাম” বলা
·
“দলিল
পাওয়া যায়নি” কিন্তু চেষ্টা করা হয়নি
No comments