রায়, ডিক্রী ও আদেশের সংজ্ঞা
রায়, ডিক্রী ও আদেশের সংজ্ঞা
(ক)
রায়
(Judgment)
সংজ্ঞা:
সিভিল প্রসিডিউর কোড (CPC) অনুযায়ী, রায় হলো আদালতের লিখিত সিদ্ধান্ত, যা মামলার সব
বিষয় বিবেচনা করে, বাদীর দাবির পূর্ণতা বা খারিজ করার বিষয়ে নির্দেশ দেয়।অর্থাৎ রায় হলো মামলার মূল বিষয়ের নিষ্পত্তি।
উদাহরণ:
·
মামলার
বাদী চায় প্রপার্টি হস্তান্তর করা হোক। আদালত সিদ্ধান্ত দেয় → প্রপার্টি হস্তান্তর করা হবে বা হবে না
→ এই সিদ্ধান্ত হল রায়।
(খ)
ডিক্রী
(Decree)
সংজ্ঞা:ডিক্রী হলো আদালতের রায়ের লিখিত বাস্তবায়নযোগ্য রূপ, যা মামলার ফর্মাল নথি হিসাবে প্রকাশ পায়।সহজভাবে: রায় হলো সিদ্ধান্ত, ডিক্রী হলো সেই সিদ্ধান্তকে কার্যকর করার আনুষ্ঠানিক দলিল।
প্রকার:
1. মূল ডিক্রী (Preliminary
Decree): মামলা
সম্পূর্ণভাবে সমাধান হয়নি, কেবল দাবির স্বীকৃতি বা সীমা নির্ধারণ করা হয়।
2. চূড়ান্ত ডিক্রী (Final Decree):
মামলা সম্পূর্ণভাবে সমাধান এবং বাস্তবায়নযোগ্য।
(গ)
আদেশ
(Order)
সংজ্ঞা:
·
আদেশ
হলো আদালতের মধ্যবর্তী নির্দেশ বা ব্যবস্থাপত্র, যা মামলার পরিচালনা
বা আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে।এটি মূল মামলার ফলাফল নির্ধারণ করে না।
উদাহরণ:
·
তারিখ
নির্ধারণ করা, দলিল আনা আদেশ, সাক্ষী হাজির করার আদেশ।
·
রায়, ডিক্রী ও আদেশের মধ্যে পার্থক্য
|
বিষয় |
ডিক্রী (Decree) |
আদেশ (Order) |
|
সংজ্ঞা |
রায়ের লিখিত, আনুষ্ঠানিক এবং
বাস্তবায়নযোগ্য রূপ |
আদালতের মধ্যবর্তী বা
প্রক্রিয়াগত নির্দেশ বা
ব্যবস্থাপত্র, যা
মামলার পরিচালনা বা
আচরণ
নিয়ন্ত্রণ করে |
|
উদ্দেশ্য |
রায়
কার্যকর করার
জন্য
দলিল
স্বরূপ প্রকাশ |
মামলার প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করা,
কিন্তু মূল
বিষয়ে নিষ্পত্তি নয় |
|
ফলাফলের ধরণ |
রায়ের বাস্তবায়নযোগ্য দলিল |
মধ্যবর্তী বা
প্রক্রিয়াগত নির্দেশ |
|
আপীলযোগ্যতা |
সাধারণত হ্যাঁ (মূল
ডিক্রী) |
সীমিত বা
বিশেষ ক্ষেত্রে |
|
উদাহরণ |
“জমি হস্তান্তর করতে
হবে”
বা
“টাকা
আদায় করা
যাবে” |
“সাক্ষী হাজির করুন”,
“দলিল
আদালতে দাখিল করুন” |
মূল ডিক্রীর বিরুদ্ধে আপীল করার নিয়ম
(ক) আপীলযোগ্য ডিক্রী
·
সাধারণত
চূড়ান্ত বা মূল ডিক্রী বিরুদ্ধে আপীল করা যায়।
·
মধ্যবর্তী
বা আদেশ সাধারণত আপীলযোগ্য নয়, যদি না আইন অন্যভাবে
নির্দেশ করে।
(খ) সময়সীমা
·
বাংলাদেশী
সিভিল প্রসিডিউর কোড অনুযায়ী:
o
আপীল
দায়ের
সময়সীমা:
মূল ডিক্রী পাওয়ার তারিখ থেকে ৩০ দিন।
o
আদালত
যুক্তিসঙ্গত কারণ দেখালে সীমা বৃদ্ধি করতে পারে।
(গ) আবেদন পদ্ধতি
1. লিখিত আপীল দায়ের করা
o
আদালতে
আপীল আবেদন জমা দিতে হবে।
2. আপীলের নথি সংযুক্ত করা
o
মূল
ডিক্রী কপি
o
ডিক্রী
বা রায়ে আপীল করার কারণ (grounds for appeal)
o
প্রয়োজনীয়
দলিলাদি
3. আদালতের শুল্ক / ফি পরিশোধ করা
o
আইন
অনুযায়ী আপীল ফি দিতে হবে।
4. নোটিশ জারি
o
প্রতিপক্ষকে
আপীলের খবর জানাতে নোটিশ পাঠানো হয়।
আপীলের
কার্যকারিতা
·
আপীলের
মাধ্যমে
উচ্চ
আদালত:
1. ডিক্রী স্থায়ী রাখতে পারে
2. ডিক্রী সংশোধন করতে পারে
3. ডিক্রী বাতিল বা পূর্ণভাবে খারিজ করতে পারে
·
গুরুত্বপূর্ণ:
আপীল করা মানে ডিক্রী স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয় না, যতক্ষণ না আদালত সিদ্ধান্ত
দেয়।
একটি ডিক্রির বিষয়বস্তু (Contents of a
Decree)
ডিক্রি হলো আদালতের রায়ের আনুষ্ঠানিক ও বাস্তবায়নযোগ্য দলিল, এবং এটি সাধারণত নিম্নলিখিত বিষয়বস্তু অন্তর্ভুক্ত করে:
1. মামলার পরিচিতি ও নম্বর
o
মামলার
নম্বর, মামলা দায়েরের তারিখ, আদালতের নাম
2. পক্ষদের নাম ও পরিচয়
o
বাদী
ও বিবাদীর নাম ও ঠিকানা
3. রায়ের সংক্ষিপ্ত বিবরণ
o
মামলার
মূল দাবি মঞ্জুর বা খারিজ হয়েছে
o
কিসের
জন্য মামলাটি চালানো হয়েছে
4. ডিক্রির ধরণ
o
চূড়ান্ত
(Final Decree) বা প্রাথমিক/মুখ্য (Preliminary /
Original Decree)
5. বাস্তবায়ন সংক্রান্ত নির্দেশাবলী
o
টাকা
আদায়, সম্পত্তি হস্তান্তর, জব্দ ইত্যাদি
6. আপীল সংক্রান্ত নির্দেশ (যদি প্রযোজ্য)
o
কবে
এবং কোন আদালতে আপীল করা যাবে
সংক্ষেপে বলা যায়, ডিক্রি হলো রায়ের আনুষ্ঠানিক ও বাস্তবায়নযোগ্য রূপ, যাতে মামলা কার্যকরভাবে সম্পন্ন হয়।
একতরফা ডিক্রি (Ex Parte Decree)
সংজ্ঞা:
·
একতরফা
ডিক্রি হলো যে আদালতের ডিক্রি দেওয়া হয় মামলার এক পক্ষ অনুপস্থিত থাকায়, কিন্তু অন্য পক্ষ উপস্থিত এবং দাবির পক্ষে প্রমাণ দাখিল করেছে।এটি সাধারণত বাদীর দাবির পূর্ণ বা আংশিক মঞ্জুর করার জন্য দেওয়া হয়।
মূল বৈশিষ্ট্য:
1. একতরফা ডিক্রি শুধুমাত্র একপক্ষের অনুপস্থিতির কারণে দেওয়া হয়।
2. উপস্থিত পক্ষের দাবির ভিত্তিতে আদালত ডিক্রি প্রদান করে, কিন্তু অনুপস্থিত পক্ষের জন্য আইনি প্রতিকার রাখা হয়।
3. এটি মুখ্য দাবি বা প্রাথমিক ডিক্রির ক্ষেত্রেও দেওয়া যায়, যদি আদালত অন্য পক্ষের অনুপস্থিতি দেখে।
উদাহরণ:
·
জমি
ফেরতের মামলা: বাদী আদালতে হাজির, বিবাদী অনুপস্থিত → আদালত একতরফা ডিক্রি দিয়ে জমি ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেয়।
·
ঋণ
আদায় মামলা: বাদী উপস্থিত, বিবাদী অনুপস্থিত → আদালত ঋণের পরিমাণ ও আদায়ের নির্দেশ
দেয়।
·
একতরফা
ডিক্রি দেওয়া হলেও অনুপস্থিত পক্ষকে পরে প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়।
একতরফা ডিক্রির বিরুদ্ধে প্রতিকার
একতরফা ডিক্রির বিরুদ্ধে আইনগতভাবে দুইটি প্রধান প্রতিকার বিদ্যমান:
(ক) বাতিলের আবেদন (Setting Aside the
Ex Parte Decree)
·
কারা
করতে
পারে:
যে পক্ষের অনুপস্থিতির কারণে ডিক্রি দেওয়া হয়েছে।
·
শর্ত:
অনুপস্থিতির যুক্তিসঙ্গত কারণ থাকতে হবে।
·
যেমন
যুক্তিসঙ্গত
কারণ:
1. অসুস্থতা বা হাসপাতালে থাকা
2. আদালতের নোটিশ বা ডাক না
পৌঁছানো
3. প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা দুর্ঘটনা (বন্যা,
ভূমিধস, দুর্ঘটনা)
4. জরুরি সরকারি বা আইনগত বাধ্যবাধকতা
·
প্রক্রিয়া:
1. আদালতে লিখিত আবেদন দাখিল
2. অনুপস্থিতির কারণ ও প্রমাণাদি (চিকিৎসা
সনদ, নোটিশ প্রমাণ) সংযুক্ত
·
ফলাফল:
o
আদালত
যদি আবেদন গ্রহণ করে → একতরফা ডিক্রি বাতিল বা স্থগিত করতে পারে।
মামলা পুনরায় চালানোর আবেদন (Restoration of
Suit)
·
যদি
মামলা খারিজ হয়ে যায় বা ডিক্রি দেওয়া
হয়েছে → অনুপস্থিত পক্ষ মামলা পুনরায় চালুর আবেদন করতে পারে।
·
শর্ত:
1. আবেদন যথাযথ সময়সীমার মধ্যে করতে হবে
2. অনুপস্থিতির যুক্তিসঙ্গত কারণ আদালতে প্রমাণ করতে হবে
·
ফলাফল:
o
আদালত
মামলা পুনরায় চালু করার নির্দেশ দিতে পারে, যাতে পক্ষ ন্যায্য সুযোগ পায়।
No comments