তামাদি আইন ১৯০৮ এর ৩ ধারা অনুযায়ী কোন মামলা বারিত হলে তার ফলাফল কী? তামাদি আইন ১৯০৮ এর ১২ ধারা অনুযায়ী আইনানুগ কার্যধারায় যে পরিমাণ সময় গণনা হতে বাদ দিতে হবে তা আলোচনা কর।তামাদি আইন ১৯০৮ এর ১২ ধারা অনুযায়ী আইনানুগ কার্যধারায় যে পরিমাণ সময় গণনা হতে বাদ দিতে হবে তা আলোচনা কর।মামলা করার অধিকার অর্জনের পূর্বে মৃত্যুর ফলাফল কী?
৬. ক)
তামাদি আইন ১৯০৮ এর ৩ ধারা
অনুযায়ী কোন মামলা বারিত হলে তার ফলাফল কী?
(খ) তামাদি আইন ১৯০৮ এর ১২ ধারা অনুযায়ী আইনানুগ কার্যধারায় যে পরিমাণ সময় গণনা হতে বাদ
দিতে হবে তা আলোচনা কর।
(গ)
দিতে হবে তা আলোচনা কর।
(ঘ) মামলা করার
অধিকার অর্জনের পূর্বে মৃত্যুর ফলাফল কী?
তামাদি আইন ১৯০৮, ধারা ৩ অনুযায়ী মামলা বারিত হলে ফলাফল
১. ভূমিকা
তামাদি
আইন
১৯০৮
(Limitation Act, 1908) মূলত
মামলা ও দাবির জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করে।আইনটি দীর্ঘ বিলম্ব প্রতিরোধের জন্য, সামাজিক ও আইনি স্থিতিশীলতা
রক্ষার জন্য তৈরি।ধারা ৩ অনুযায়ী, যে মামলা নির্ধারিত তামাদি সময়সীমার মধ্যে দাখিল করা হয়নি, সেই মামলা আদালতে কার্যকর হবে না। এর ফলে আদালত
ও পক্ষদের জন্য সময়মিত, কার্যকর ও নির্ভরযোগ্য বিচারব্যবস্থা নিশ্চিত হয়।
২. মামলা বারিত হলে অর্থাৎ ‘মেয়াদোত্তীর্ণ’ হলে ফলাফল
1. মামলা খারিজ/বাতিল হবে
ধারা ৩ অনুযায়ী, তামাদি
সময় পার হওয়া মামলাটি আদালত গ্রহণ করবে না।মামলা আর বিচারযোগ্য নয়,
ফলে কোন আদেশ বা প্রতিকার মিলবে
না।
2. আইনগত প্রভাব
মামলাকারীর অধিকার আইনগতভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত।আদালত এই মামলার ভিত্তিতে
কোনো প্রতিকার বা ক্ষতিপূরণ প্রদান
করতে পারবে না।
3. দাবিদারের স্বেচ্ছায় পরিশোধ
মামলাকারী যদি নিজ উদ্যোগে দাবিটি পরিশোধ করে, তা আইনগতভাবে পুনরুদ্ধারযোগ্য নয়।অর্থাৎ, আদালতের মাধ্যমে আর কোনো অধিকার
দাবি করা যায় না।
4. সামাজিক ও আইনি উদ্দেশ্য
প্রমাণাদি হারানো বা সাক্ষীদের ভুলে
যাওয়া প্রতিরোধ করা।দীর্ঘকাল ধরে অব্যবহৃত দাবিকে সীমিত করা।সামাজিক ও আইনি স্থিতিশীলতা
নিশ্চিত করা।
৩. উদাহরণ
·
ব্যক্তি
A, B-এর উপর মামলা করতে চায় কিন্তু নির্ধারিত ৩ বছরের মেয়াদ পেরিয়ে গেছে।
·
ধারা
৩ অনুযায়ী, আদালত এই মামলা গ্রহণ
করবে
না।
·
A আর
আদালতের মাধ্যমে কোনো প্রতিকার পাবে না।
৪. উপসংহারধারা ৩ অনুসারে: “মেয়াদোত্তীর্ণ মামলা আদালতে খারিজ হবে।”এটি
নিশ্চিত করে:দীর্ঘ বিলম্ব প্রতিরোধ।প্রমাণ ও সাক্ষীর ক্ষতি
এড়ানো।সামাজিক ও আইনি স্থিতিশীলতা
রক্ষা।
তামাদি আইন ১৯০৮, ধারা ১২ অনুযায়ী সময় গণনা থেকে বাদ দেওয়ার নিয়ম
১. ভূমিকা
·
তামাদি
আইন
১৯০৮
(Limitation Act, 1908) মূলত
মামলার জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা (Limitation
Period) নির্ধারণ
করে।ধারা ১২ বিশেষভাবে মেয়াদ গণনার ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম নির্ধারণ করে।এই ধারা নিশ্চিত করে যে, কিছু পরিস্থিতিতে দাবিদার আইনগতভাবে মামলা করতে অক্ষম থাকলে, সেই সময় মেয়াদ গণনা থেকে বাদ দেওয়া হবে।উদ্দেশ্য: ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং অযোগ্য বা বাধাগ্রস্ত দাবিদারকে
সম্পূর্ণ অধিকার দেওয়া।
২. কোন সময় গণনা থেকে বাদ দেওয়া হবে (প্রধান শর্তসমূহ)
(ক) দাবিদারের অক্ষমতা
মামলা
করার সময় দাবিদার শিশু বা মানসিকভাবে অক্ষম হলে তার ক্ষমতায় আসার আগে সময় গণনা হয় না।উদাহরণ: একজন শিশু যদি ১৫ বছরের পুরনো
মামলার অধিকার রাখে, তবে তার বয়স পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত মেয়াদ গণনা স্থগিত থাকবে।
(খ) আদালতের কার্যক্রমের স্থগিতকাল
যদি
আদালত কোনও কারণে কার্যধারা স্থগিত করে (ছুটি, পরিবেশগত কারণে বন্ধ, প্রসিকিউটর অনুপস্থিতি), সেই সময় গণনা থেকে বাদ।এর উদ্দেশ্য: দাবিদারকে ন্যায্য সুযোগ দেওয়া।
(গ) যুদ্ধ, দুর্যোগ বা সরকারী বাধা
যুদ্ধ,
মহামারী, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা সরকারি বাধার
কারণে মামলা দাখিল করা সম্ভব না হলে, সেই সময় গণনা থেকে বাদ।উদাহরণ: দেশজুড়ে যুদ্ধ বা লকডাউন অবস্থায়
আদালত বন্ধ থাকলে।
(ঘ) আইনগত প্রতিনিধি বা অভিভাবকের কারণে বিলম্ব
শিশু বা মানসিকভাবে অক্ষম
ব্যক্তির ক্ষেত্রে আইনগত অভিভাবক বা প্রতিনিধি মামলার জন্য দায়িত্ব নেবার আগে সময় গণনা বাদ।উদ্দেশ্য: দাবিদারের স্বাভাবিক অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত না হওয়া।
৩. ফলাফল / প্রভাব
1. এই সময়গুলো মেয়াদ গণনায় অন্তর্ভুক্ত হয় না, অর্থাৎ মামলা করার জন্য অতিরিক্ত সময় পাওয়া যায়।
2. এটি দাবিদারের অধিকারকে রক্ষা করে, যাতে তিনি ন্যায়বিচার পেতে পারে।
3. আদালত এই ব্যতিক্রমগুলো বিবেচনা
করে মেয়াদোত্তীর্ণ মামলাকে গ্রহণযোগ্য করতে পারে যদি বাদ দেওয়া সময় যথাযথ হয়।
4. মূল উদ্দেশ্য: অবৈধ বিলম্ব থেকে আইনি ন্যায়রক্ষা করা।
৪. উদাহরণ
·
ব্যক্তি
A মানসিকভাবে অক্ষম ছিল ২০১০–২০১৫ পর্যন্ত।
·
তার
বিরুদ্ধে মামলা ২০১২ সালে দায়ের করার যোগ্য ছিল।
·
ধারা
১২ অনুযায়ী, ২০১০–২০১৫ সময় গণনা থেকে বাদ যাবে।
·
ফলে
A তার ক্ষমতা ফিরে পাওয়ার পরও আইনগতভাবে সময়মতো মামলা করতে সক্ষম হবে।
তামাদি আইন ১৯০৮, ধারা ৬: বৈধ অপারগতা (Disabilities) ও ফলাফল
১. ভূমিকা
·
ধারা
৬
নির্ধারণ করে যে, কোনো ব্যক্তি যদি বৈধ কারণে তার অধিকার আইন অনুযায়ী কার্যকর করতে অক্ষম থাকে, তাহলে সেই সময় মেয়াদ গণনা থেকে বাদ হবে।মূল উদ্দেশ্য: দাবিদারের অধিকার রক্ষা করা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। বৈধ অপারগতা (Valid
Disabilities) বলতে সেই পরিস্থিতি বোঝায় যা দাবিদারকে মামলা বা অন্য আইনি কার্যক্রম চালাতে অক্ষম করে।
২. বৈধ অপারগতার ধরন
(ক) শিশু / নাবালক (Minor / Infant)
যদি
মামলাকারী শিশু বা নাবালক হয়, তিনি নিজে মামলা করতে সক্ষম নয়।
·
সময়
গণনা:
তার পূর্ণবয়সী হওয়া পর্যন্ত মেয়াদ স্থগিত।
·
উদাহরণ:
একজন শিশু যদি তার সম্পত্তি হারানোর মামলার অধিকার রাখে, তবে তিনি পূর্ণবয়সী হওয়া পর্যন্ত আদালতে মামলা দায়ের করতে পারবেন না।
(খ) মানসিকভাবে অক্ষম ব্যক্তি (Person of Unsound Mind)
·
মানসিকভাবে
অক্ষম ব্যক্তি তার অধিকার ব্যবহার করতে পারবে না।
·
সময়
গণনা:
অক্ষমতার সময় গণনা থেকে বাদ।
·
উদাহরণ:
মানসিক অসুস্থতার কারণে কেউ মামলা করতে পারলে তার মেয়াদ তার পুনরুদ্ধার পর্যন্ত স্থগিত থাকবে।
(গ) মৃত্যু বা জীবননাশ (Death / Life Incapacity)
·
যদি
মামলা করার পূর্বে ব্যক্তি মারা যায়, তিনি নিজে মামলা করতে পারবে না।
·
ফলাফল:
উত্তরাধিকারী বা আইনগত প্রতিনিধি
(legal representative) মামলা
চালাতে পারে যদি মেয়াদ এখনও চলমান থাকে।
(ঘ) সরকারী বাধা বা দুর্যোগ (Governmental / Natural
Hindrance)
·
যুদ্ধ,
মহামারী, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, আদালতের কার্যক্রম বন্ধ থাকা ইত্যাদি কারণে মামলা করা সম্ভব না হলে সেই
সময় মেয়াদ গণনা থেকে বাদ।
·
উদাহরণ:
যুদ্ধ বা লকডাউনের সময়
আদালত বন্ধ থাকলে।
৩. বৈধ অপারগতার ফলাফল
1. মেয়াদ স্থগিত (Suspension of
Limitation)
o
বৈধ
অপারগতার সময় তামাদি সময় গণনায় অন্তর্ভুক্ত হয় না।
2. দাবিদারের অধিকার রক্ষা
o
দাবিদার
তার অধিকার হারায় না এবং ন্যায়বিচারের
সুযোগ পাবেন।
3. আদালতের কার্যক্রমে প্রভাব
o
আদালত
এই অপারগতা বিবেচনা করে মেয়াদোত্তীর্ণ মামলা গ্রহণযোগ্য করতে পারে।
4. সামাজিক ও আইনগত উদ্দেশ্য
o
দীর্ঘমেয়াদী
বিলম্ব থেকে উদ্ভূত অস্পষ্টতা ও প্রমাণ ক্ষয়
প্রতিরোধ।
o
ন্যায়বিচার
এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত।
৪. উদাহরণ
·
ব্যক্তি
A ২০১০–২০১৫ পর্যন্ত মানসিকভাবে অক্ষম ছিলেন।
·
তার
বিরুদ্ধে মামলা ২০১২ সালে হওয়ার যোগ্য ছিল।
·
ধারা
৬ অনুযায়ী, ২০১০–২০১৫ সময় গণনা থেকে বাদ।
·
ফলে
A ক্ষমতা ফিরে পাওয়ার পরও মামলা করতে সক্ষম।
মামলা করার অধিকার অর্জনের পূর্বে মৃত্যুর ফলাফল
আইনের সাধারণ নীতি হলো— যখন কোনো ব্যক্তির অনুকূলে মামলা করার অধিকার (Right to Sue) জন্মায়, তখনই কেবল তিনি বা তার আইনগত প্রতিনিধি আদালতে মামলা দায়ের করতে পারেন। কিন্তু যদি মামলা করার অধিকার অর্জনের পূর্বেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মৃত্যু ঘটে, তাহলে তার আইনগত ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
১। মামলা করার অধিকার সৃষ্টি না হওয়া
মামলা করার অধিকার অর্জনের পূর্বে মৃত্যুর অর্থ হলো— সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জীবদ্দশায় কোনো cause of
action (মামলার
কারণ) সৃষ্টি হয়নি। যেহেতু cause of action ছাড়া মামলা দায়ের করা যায় না, সেহেতু মৃত্যুর ফলে মামলা করার অধিকার আদৌ জন্মায় না।
২। আইনগত প্রতিনিধির মামলা করার অক্ষমতা
আইনগত প্রতিনিধি কেবলমাত্র মৃত ব্যক্তির বিদ্যমান অধিকার ও দায়িত্ব উত্তরাধিকারসূত্রে
গ্রহণ করতে পারেন। কিন্তু যেহেতু মৃত ব্যক্তির জীবদ্দশায় মামলা করার কোনো অধিকার সৃষ্টি হয়নি, সেহেতু আইনগত প্রতিনিধির কাছেও সে অধিকার হস্তান্তরিত
হয়
না। ফলে তারা
মামলা দায়ের করতে পারেন না।
৩। মামলা দায়ের করলে তা অগ্রহণযোগ্য
যদি মামলা করার অধিকার জন্মের পূর্বেই মৃত্যু ঘটে এবং তবুও যদি কোনো মামলা দায়ের করা হয়, তবে আদালত সেই মামলাকে আইনগতভাবে অগ্রহণযোগ্য (Not
Maintainable) বলে
ঘোষণা করবে। এ ধরনের মামলা
বিচারযোগ্য নয় এবং প্রাথমিক পর্যায়েই খারিজযোগ্য।
৪। ব্যক্তিগত অধিকার সম্পূর্ণরূপে লোপ পাওয়া
মামলা করার অধিকার অর্জনের পূর্বে মৃত্যু হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ব্যক্তিগত অধিকার সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত হয়ে যায়। এই অধিকার
আর কোনোভাবেই পুনর্জীবিত হয় না।
৫। ব্যতিক্রমের অনুপস্থিতি
এক্ষেত্রে সাধারণত কোনো ব্যতিক্রম প্রযোজ্য নয়, কারণ আইন কেবল বিদ্যমান অধিকার সংরক্ষণ করে; ভবিষ্যতে সম্ভাব্য অধিকারকে নয়।
উপসংহার
সুতরাং বলা যায় যে, মামলা করার অধিকার অর্জনের পূর্বে যদি কোনো ব্যক্তির মৃত্যু ঘটে, তবে মামলা করার অধিকার সৃষ্টি হয় না, আইনগত প্রতিনিধিও মামলা করতে পারে না এবং যেকোনো দায়েরকৃত মামলা আইনগতভাবে অগ্রহণযোগ্য হয়। এটি দেওয়ানি কার্যবিধি ও তামাদি আইনের
মৌলিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
No comments