ন্যায়পরায়ণতার ম্যাক্সিম বলতে কী বুঝ? ম্যাক্সিম গুলো ন্যায়পরনতা সীমাবদ্ধ করেছে এটি কী তুমি সমর্থন কর? নিমোক্ত যে কোন দুটি নীতি ব্যাখ্যা কর (i) ন্যায়পরতার প্রার্থীকে অবশ্যই পরিস্কার হয়ে আসতে হবে বা ন্যয়পরায়ন হইতে হবে। (ii) ন্যায়পরতা ব্যক্তি কেন্দ্রিক কাজ করে (iii) ন্যায়পরতা প্রতিকার বিহীন কোন আচরন সহ্য করে না (iv)বিলম্ব ন্যায়পরতা কে ব্যর্থ করে
ক) ন্যায়পরায়ণতার ম্যাক্সিম বলতে কী বুঝ? ম্যাক্সিম গুলো ন্যায়পরনতা সীমাবদ্ধ করেছে এটি কী
তুমি সমর্থন কর?
নিমোক্ত যে কোন দুটি নীতি ব্যাখ্যা কর
(i) ন্যায়পরতার প্রার্থীকে অবশ্যই পরিস্কার হয়ে আসতে হবে বা ন্যয়পরায়ন হইতে হবে।
(ii) ন্যায়পরতা ব্যক্তি কেন্দ্রিক কাজ করে
(iii) ন্যায়পরতা প্রতিকার বিহীন কোন আচরন সহ্য করে না
(iv)বিলম্ব ন্যায়পরতা কে ব্যর্থ করে
ন্যায়পরায়ণতার
ম্যাক্সিম
(Maxims of Equity) বলতে
ন্যায়পরায়ণতা বা Equity প্রয়োগের ক্ষেত্রে আদালত যে মৌলিক নীতিসমূহ
অনুসরণ করে, সেই নীতিগত সূত্র বা উক্তিগুলোকে বোঝায়।
এগুলো কোনো লিখিত আইন নয়; বরং বিচারকদের অভিজ্ঞতা ও নৈতিক ধারণা
থেকে গড়ে ওঠা সাধারণ ন্যায়বোধের নিয়ম, যার মাধ্যমে কঠোর আইনের ত্রুটি সংশোধন করে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হয়।
সংক্ষেপে বলা যায়—
ন্যায়পরায়ণতার ম্যাক্সিম হলো এমন কিছু মৌলিক নীতি, যা আদালতকে ন্যায়,
সততা ও সুবিচারের ভিত্তিতে
সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে, বিশেষত যেখানে কেবল আইনের কঠোর প্রয়োগে অন্যায় হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
ম্যাক্সিম গুলো
ন্যায়পরনতা সীমাবদ্ধ
করেছে এটি
কী তুমি
সমর্থন কর?
হ্যাঁ,
ম্যাক্সিমগুলো ন্যায়পরায়ণতাকে সীমাবদ্ধ করেছে—আমি এটি সমর্থন করি। নিচে
বিষয়টি
বিস্তৃতভাবে ব্যাখ্যা করা
হলো—
ভূমিকা
ন্যায়পরায়ণতা (Equity) মূলত কঠোর
আইনের
(Strict Law) কঠিনতা
ও
অন্যায়
ফল
সংশোধনের জন্য
বিকশিত
হয়েছে।
প্রাথমিক অবস্থায় ন্যায়পরায়ণতা ছিল
অত্যন্ত নমনীয়
এবং
বিচারকের নৈতিক
বিবেচনার উপর
নির্ভরশীল। কিন্তু
সময়ের
সঙ্গে
সঙ্গে
দেখা
যায়,
অতিরিক্ত নমনীয়তা বিচার
ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা ও
স্বেচ্ছাচারিতা সৃষ্টি
করতে
পারে।
এই
সমস্যা
সমাধানের জন্যই
ন্যায়পরায়ণতার ম্যাক্সিমগুলো গড়ে
ওঠে।
কীভাবে ম্যাক্সিম ন্যায়পরায়ণতাকে সীমাবদ্ধ করেছে
ন্যায়পরায়ণতার ম্যাক্সিমগুলো কিছু
নির্দিষ্ট নীতির
মাধ্যমে আদালতের ক্ষমতার ওপর
নিয়ন্ত্রণ আরোপ
করেছে।
ফলে—
- বিচারক ইচ্ছামতো
ন্যায়পরায়ণতা প্রয়োগ করতে পারেন না
- ন্যায়পরায়ণ
প্রতিকার পেতে হলে আবেদনকারীকে নির্দিষ্ট নৈতিক ও
আচরণগত শর্ত পূরণ করতে হয়
- প্রতিটি মামলায় ন্যায়পরায়ণতা
প্রয়োগের জন্য নির্দিষ্ট কাঠামো অনুসরণ করতে হয়
এই
কারণে
বলা
হয়,
ম্যাক্সিমগুলো ন্যায়পরায়ণতাকে সীমাবদ্ধ করেছে।
কেন এই সীবদ্ধতা প্রয়োজনীয়
এই
সীমাবদ্ধতা না
থাকলে
ন্যায়পরায়ণতা—
- বিচারকের
ব্যক্তিগত নৈতিকতার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ত
- একই ধরনের ঘটনায় ভিন্ন ভিন্ন রায় হতো
- আইনগত নিশ্চয়তা
ও
স্থায়িত্ব নষ্ট হতো
ম্যাক্সিমের মাধ্যমে ন্যায়পরায়ণতা একটি
নীতি-নির্ভর ও শৃঙ্খলাবদ্ধ ব্যবস্থাতে পরিণত হয়েছে।
আমি কেন এই সীমাবদ্ধতাকে সমর্থন করি
১. স্বেচ্ছাচারিতা রোধ করে
ম্যাক্সিম বিচারকের ক্ষমতার সীমা
নির্ধারণ করে,
ফলে
ব্যক্তিগত পছন্দ
বা
পক্ষপাতের সুযোগ
কমে।
২. ন্যায়বিচারে সামঞ্জস্য আনে
একই
পরিস্থিতিতে একই
ধরনের
সিদ্ধান্ত দেওয়া
সম্ভব
হয়,
যা
ন্যায়বিচারের মৌলিক
দাবি।
৩. নৈতিকতা ও শৃঙ্খলার সমন্বয়
ন্যায়পরায়ণতা শুধু
অনুভূতির বিষয়
না
হয়ে
যুক্তিনির্ভর নীতিতে
পরিণত
হয়।
৪. বিচার ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা বৃদ্ধি
নির্দিষ্ট ম্যাক্সিম অনুসরণ
করার
ফলে
জনগণের
বিচার
ব্যবস্থার প্রতি
আস্থা
বাড়ে।
সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও ন্যায়পরায়ণতার প্রকৃতি
ম্যাক্সিমগুলো ন্যায়পরায়ণতাকে সম্পূর্ণ কঠোর
করেনি।
বরং
এগুলো
নির্দেশক নীতি, বাধ্যতামূলক আইন
নয়।
বিচারক
পরিস্থিতি অনুযায়ী ম্যাক্সিম প্রয়োগ
বা
ব্যতিক্রম করতে
পারেন,
তবে
তা
যুক্তিসংগত হতে
হয়।
উপসংহার
অতএব,
যদিও
ম্যাক্সিমগুলো ন্যায়পরায়ণতাকে সীমাবদ্ধ করেছে,
এই
সীমাবদ্ধতা ন্যায়পরায়ণতার স্বার্থেই প্রয়োজনীয়। এটি ন্যায়পরায়ণতাকে দুর্বল
না
করে
বরং
শক্তিশালী, সুসংগঠিত ও ন্যায়সঙ্গত করেছে।
এই
কারণেই
আমি
ম্যাক্সিমের মাধ্যমে ন্যায়পরায়ণতার সীমাবদ্ধতাকে সম্পূর্ণভাবে সমর্থন
করি।
(i) ন্যায়পরতার প্রার্থীকে অবশ্যই পরিস্কার হয়ে আসতে হবে বা ন্যয়পরায়ন হইতে হবে।
ন্যায়পরতার প্রার্থীকে অবশ্যই পরিস্কার হয়ে আসতে হবে বা ন্যায়পরায়ণ হইতে
হবে
(He who seeks equity must come with clean hands)
এই নীতির অর্থ হলো—যে ব্যক্তি ন্যায়পরায়ণ
আদালতের নিকট ন্যায়পরায়ণ প্রতিকার প্রার্থনা করবে, তাকে অবশ্যই সৎ, ন্যায্য ও অসৎ আচরণমুক্ত হতে হবে। ন্যায়পরায়ণতা নৈতিকতার উপর ভিত্তি করে কাজ করে; তাই যে ব্যক্তি নিজেই
প্রতারণা, জালিয়াতি বা অন্যায় কাজে
জড়িত, সে ন্যায়পরায়ণ প্রতিকার
পাওয়ার অধিকারী নয়।
এই নীতির মূল কথা হলো, আদালত কেবল বিবাদীর অন্যায় আচরণ বিবেচনা করে না, বরং আবেদনকারীর নিজস্ব আচরণ ও সততাও বিবেচনায় আনে।
যদি দেখা যায় যে আবেদনকারী মামলার
বিষয়বস্তুর সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো অসৎ বা অনৈতিক আচরণ
করেছে, তাহলে আদালত তাকে প্রতিকার দিতে অস্বীকার করবে।
উদাহরণস্বরূপ, কোনো ব্যক্তি যদি জাল দলিলের মাধ্যমে সম্পত্তি দখল করে পরে আদালতের কাছে নিষেধাজ্ঞা (injunction) চায়, তাহলে আদালত বলবে—সে পরিস্কার হাতে
আসেনি; ফলে সে ন্যায়পরায়ণ প্রতিকার
পাবে না।
সুতরাং, এই নীতি ন্যায়পরায়ণতার
নৈতিক ভিত্তিকে সংরক্ষণ করে এবং নিশ্চিত করে যে আদালত কখনোই
অন্যায় বা অসততার সহায়ক
হবে না।
ন্যায়পরতার প্রার্থীকে অবশ্যই পরিস্কার হয়ে আসতে হবে”—এই নীতি
ন্যায়পরায়ণতার নৈতিক আত্মাকে রক্ষা করে। এটি নিশ্চিত করে যে ন্যায়পরায়ণ আদালত
কখনোই অসৎ, প্রতারক বা অন্যায়কারীর আশ্রয়স্থল
হবে না। অতএব, ন্যায়পরায়ণ প্রতিকার পেতে হলে আবেদনকারীকে অবশ্যই নিজে ন্যায়পরায়ণ হতে হবে।
ন্যায়পরতা
ব্যক্তি
কেন্দ্রিক
কাজ
করে
এই নীতির অর্থ হলো—ন্যায়পরতা মূলত ব্যক্তির বিবেক, আচরণ ও দায়বদ্ধতার ওপর কাজ করে, সম্পত্তি বা বস্তুর ওপর
সরাসরি নয়। ন্যায়পরতার আদালত কোনো ব্যক্তিকে তার অন্যায় আচরণ থেকে বিরত থাকতে বা ন্যায়সংগত কাজ
করতে আদেশ দেয়।
অর্থাৎ, ন্যায়পরতার আদেশ ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে দেওয়া হয়, যেমন—
·
কোনো
চুক্তি বাস্তবায়নের আদেশ (Specific
Performance)
·
নিষেধাজ্ঞা
(Injunction)
·
বিশ্বাসভঙ্গ
না করার নির্দেশ
এখানে আদালত বলে না যে “এই
সম্পত্তি বদলে যাবে”, বরং বলে—“এই ব্যক্তি এমন
কাজ করবে বা করবে না”। যদি ব্যক্তি
আদালতের আদেশ অমান্য করে, তাহলে তাকে আদালত অবমাননার দায়ে শাস্তি দেওয়া হয়।
উদাহরণ:
ক যদি খ-এর সাথে
জমি বিক্রির চুক্তি করে এবং পরে তা পালন করতে
অস্বীকার করে, তাহলে ন্যায়পরতার আদালত ক-কে ব্যক্তিগতভাবে
চুক্তি পালন করতে বাধ্য করতে পারে।
এই নীতির মাধ্যমে বোঝা যায় যে ন্যায়পরতা মানুষের
বিবেক ও নৈতিক দায়িত্বকে
গুরুত্ব দেয় এবং তাই এটি ব্যক্তি কেন্দ্রিকভাবে কাজ করে, বস্তু বা সম্পত্তি কেন্দ্রিকভাবে
নয়।
ন্যায়পরতা প্রতিকার বিহীন কোনো আচরণ সহ্য করে না
এই
নীতির
অর্থ
হলো—যেখানে কোনো আইনগত অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে বা অন্যায় সংঘটিত হয়েছে, সেখানে
ন্যায়পরতা অবশ্যই
কোনো
না
কোনো
প্রতিকারের ব্যবস্থা করবে। যদি প্রচলিত কঠোর
আইনে
(common law) সেই
অন্যায়ের জন্য
উপযুক্ত প্রতিকার না
থাকে,
তবে
ন্যায়পরতার আদালত
নতুন
ও
উপযুক্ত প্রতিকার প্রদান
করে
ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে।
এ
নীতির
মূল
উদ্দেশ্য হলো—কেউ যেন কেবল
আইনের
ফাঁকফোকরের সুযোগ
নিয়ে
অন্যায়
করে
পার
না
পায়।
ন্যায়পরতা সেখানে
হস্তক্ষেপ করে,
যেখানে
আইন
নীরব
বা
অপর্যাপ্ত।
উদাহরণ:
ধরা
যাক,
কোনো
ব্যক্তি বিশ্বাসভঙ্গ করে
অন্যের
সম্পত্তি আত্মসাৎ করল।
সাধারণ
আইনে
যদি
কেবল
ক্ষতিপূরণ যথেষ্ট
না
হয়,
তবে
ন্যায়পরতা সেই
ব্যক্তিকে হিসাব
দিতে
বাধ্য
করতে
পারে
বা
সম্পত্তি ফেরত
দেওয়ার
নির্দেশ দিতে
পারে।
এই
নীতির
মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়
যে
ন্যায়পরতা অন্যায়ের বিরুদ্ধে সক্রিয়
ভূমিকা
পালন
করে
এবং
প্রতিকার ছাড়া
কোনো
অন্যায়কে মেনে
নেয়
না।
ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাই এর
মূল
লক্ষ্য।
বিলম্ব ন্যায়পরতাকে ব্যর্থ করে
এই
নীতির অর্থ হলো—যে ব্যক্তি নিজের অধিকার বা প্রতিকার পাওয়ার বিষয়ে অযৌক্তিকভাবে দীর্ঘ সময় বিলম্ব করে, ন্যায়পরতার আদালত তাকে প্রতিকার দিতে অস্বীকার করতে পারে। কারণ ন্যায়পরতা সদা সতর্ক
ও সচেতন ব্যক্তিকে সহায়তা করে, অলস বা উদাসীন ব্যক্তিকে
নয়।
দীর্ঘ
বিলম্বের ফলে—
·
প্রমাণ
নষ্ট হতে পারে,
·
পরিস্থিতি
পরিবর্তিত হতে পারে,
·
প্রতিপক্ষ
ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এই
কারণে ন্যায়পরতা মনে করে, বিলম্ব নিজেই এক ধরনের অবিচার।
উদাহরণ:
ক জানত যে খ অবৈধভাবে
তার জমি দখল করেছে, কিন্তু সে বহু বছর
কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। পরে হঠাৎ করে সে ন্যায়পরতার প্রতিকার
চাইলে আদালত বলতে পারে যে তার এই
অযৌক্তিক বিলম্বের কারণে সে প্রতিকার পাওয়ার
অধিকার হারিয়েছে।
এই নীতির মাধ্যমে বোঝা যায় যে ন্যায়পরতা সময়ানুবর্তিতা
ও সতর্কতাকে গুরুত্ব দেয় এবং অযথা বিলম্ব ন্যায়বিচারকে ব্যর্থ করে দেয়।
No comments