Header Ads

Header ADS

আন্তর্জাতিক আদালতের গঠন ও কার্যাবলি আলোচনা কর। কীভাবে এই আদালতের রায় বলবৎ হয়? কোনো ব্যক্তি কি আন্তর্জাতিক আদালতের শরণাপন্ন হতে পারে?

 

আন্তর্জাতিক আদালতের গঠন  কার্যাবলি আলোচনা কর। কীভাবে এই আদালতের রায় বলবৎ হয়কোনো ব্যক্তি কি আন্তর্জাতিক আদালতের শরণাপন্ন হতে পারে?

আন্তর্জাতিক আদালতের গঠন (Detailed)

. বিচারকের সংখ্যা 

আন্তর্জাতিক আদালতে মোট ১৫ জন বিচারক থাকেন। বিচারকরা জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশন (General Assembly) এবং নিরাপত্তা পরিষদ (Security Council) থেকে নির্বাচিত হন।

২.নির্বাচন প্রক্রিয়া: সাধারণ অধিবেশন এবং নিরাপত্তা পরিষদ উভয়ই স্বতন্ত্রভাবে ভোট দেয়।কোনো প্রার্থীকে নির্বাচিত হতে হলে উভয় ক্ষেত্রেই অধিকাংশ ভোট পেতে হবে এই প্রক্রিয়ায় বিচারকের নির্বাচন আন্তর্জাতিকভাবে নিরপেক্ষ এবং বৈধ হয়।

 

. বিচারকের যোগ্যতা

বিচারক নির্বাচনের জন্য প্রধান যোগ্যতা হলো:

  1. উচ্চ আইনজ্ঞানআন্তর্জাতিক আইন এবং রাষ্ট্রের নিজস্ব (জাতীয়) আইনে বিশদ জ্ঞান।
  2. নৈতিক ব্যক্তিগত স্বাধীনতারাষ্ট্রের প্রভাব ছাড়া সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম।
  3. রাষ্ট্রের প্রতিনিধি নয়বিচারক ব্যক্তিগতভাবে আদালতের কাজ করেন, দেশের পক্ষে নয়। অর্থাৎ, বিচারক কেবল আইন ন্যায়ের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেন।

 

. মেয়াদ

বিচারকের মেয়াদ: বছর।পুনর্নির্বাচন সম্ভব। প্রতি বছরে জন বিচারক বদলানো হয়, যাতে ধারাবাহিকতা এবং অভিজ্ঞতা বজায় থাকে।

 

. সভাপতি উপ-সভাপতি

১৫ জন বিচারক নিজেদের মধ্যে ভোট দিয়ে নির্বাচন করেন:

সভাপতি (President)আদালতের প্রশাসনিক বিচারিক কার্যাবলি তত্ত্বাবধান করে।

উপ-সভাপতি (Vice-President)সভাপতির অনুপস্থিতিতে দায়িত্ব পালন করে।

সভাপতি এবং উপ-সভাপতির মেয়াদ সাধারণত বছর

. বিচারক-সভার কাঠামো

আন্তর্জাতিক আদালত একটি একক আদালত, কিন্তু কাজের জন্য বিভিন্ন বিচারক-বিভাগ (chambers) ব্যবহার করা যায়।সর্বোচ্চ ১৫ জন বিচারক পুরো মামলা শুনে সিদ্ধান্ত দিতে পারে।ছোট ছোট চেম্বার তৈরি করা যায় দ্রুততার জন্য, কিন্তু গুরুতর মামলা সবসময় পূর্ণ আদালতে হয়।

 

সমন্বয় প্রশাসনিক কাঠামো

নির্বাহী বা প্রশাসনিক ইউনিট: আদালতের দৈনন্দিন কাজ, রেকর্ড সংরক্ষণ, মামলা তালিকা ইত্যাদি পরিচালনা করে।

প্রধান অফিসার: দাপ্তরিক প্রধান, যারা মামলার নথি প্রশাসনিক কাজ তত্ত্বাবধান করে।

 

আন্তর্জাতিক আদালতের কার্যাবলি

আন্তর্জাতিক আদালত মূলত দুইভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করে:

  1. বিচারিক কার্যাবলি (Contentious Cases / Dispute Settlement)
  2. পরামর্শমূলক কার্যাবলি (Advisory Opinions)

 

. বিচারিক কার্যাবলি (Contentious Cases)

উদ্দেশ্য: রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আইনগত বিরোধ নিষ্পত্তি করা।

প্রধান বৈশিষ্ট্য:

  • কেবল রাষ্ট্রসমূহের বিরোধ সমাধান করে।
  • ব্যক্তি, সংস্থা বা কোম্পানি মামলা করতে পারে না।
  • আদালতের রায় চূড়ান্ত বাধ্যতামূলক, তবে বাস্তবায়নের জন্য রাষ্ট্রের সম্মতি প্রয়োজন।

প্রক্রিয়া:

  1. রাষ্ট্রের সম্মতি: আদালতের এখতিয়ারে মামলা গ্রহণের জন্য রাষ্ট্রের সম্মতি বাধ্যতামূলক।
  2. লিখিত দলিল (Written Proceedings): রাষ্ট্ররা নিজেদের অভিযোগ, প্রতিরক্ষা আইনি যুক্তি জমা দেয়।
  3. মৌখিক শুনানি (Oral Proceedings): রাষ্ট্রের প্রতিনিধি আদালতে উপস্থিত হয়ে যুক্তি উপস্থাপন করে।
  4. চূড়ান্ত রায় (Judgment): আদালত মামলার সিদ্ধান্ত দেয়, যা বাধ্যতামূলক।

উদাহরণ:

  • নিকারাগুয়া বনাম যুক্তরাষ্ট্র (1986) – যুক্তরাষ্ট্রের নিকারাগুয়ায় হস্তক্ষেপের বিরোধ।
  • ভারত বনাম পাকিস্তানকাশ্মীর সংক্রান্ত সীমান্ত বিরোধ।

. পরামর্শমূলক কার্যাবলি (Advisory Opinions)

উদ্দেশ্য: রাষ্ট্র বা আন্তর্জাতিক সংস্থাকে আইনগত পরামর্শ প্রদান করা।

প্রধান বৈশিষ্ট্য:

  • জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশন বা বিশেষ সংস্থা আদালতের কাছে পরামর্শ চাইতে পারে
  • রায় বাধ্যতামূলক নয়, কিন্তু আন্তর্জাতিক আইন ব্যাখ্যা নীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ।

প্রক্রিয়া:

  1. অনুরোধ: রাষ্ট্র বা সংস্থা আদালতের কাছে আইনগত পরামর্শ চায়।
  2. বিশ্লেষণ: আদালত বিষয়টি আইনগতভাবে বিশ্লেষণ করে।
  3. মতামত (Advisory Opinion): আদালত পরামর্শমূলক রায় জারি করে।

উদাহরণ:

  • ১৯৭১: প্যালেস্টাইনের আইনি অবস্থা।
  • ১৯৯৬: নিউক্লিয়ার অস্ত্র ব্যবহার সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক আইন।

 

. কার্যাবলির গুরুত্ব

আন্তর্জাতিক আইন রক্ষা করে।রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে শান্তিপূর্ণ বিরোধ সমাধান নিশ্চিত করে।জাতিসংঘ অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা আইনগত দিকনির্দেশনা পায়।আন্তর্জাতিক আদালত আইনের প্রতি বিশ্বস্ততা বৃদ্ধি পায়।

 

. সীমাবদ্ধতা

কেবল রাষ্ট্রের বিরোধের ক্ষেত্রে কার্যকর।আদালতের রায় বাস্তবায়নের জন্য রাষ্ট্রের সম্মতি প্রয়োজন।ব্যক্তি বা সংস্থা মামলা করতে পারে না। রাজনৈতিক প্রভাব হতে পারে।

 

পরিশেষে আন্তর্জাতিক আদালত রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বিরোধ সমাধান এবং আন্তর্জাতিক আইন রক্ষায় প্রধান ভূমিকা পালন করে। এর বিচারিক কার্যাবলি রাষ্ট্রকে চূড়ান্ত রায় দেয়, আর পরামর্শমূলক কার্যাবলি আন্তর্জাতিক সংস্থা রাষ্ট্রকে আইনগত নির্দেশনা প্রদান করে।

উপসংহার

আন্তর্জাতিক আদালত রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বিরোধ সমাধান এবং আন্তর্জাতিক আইন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এর গঠন নিশ্চিত করে স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা, আর কার্যাবলি রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক সংস্থাকে আইনগত রায় পরামর্শ প্রদান করে।

আন্তর্জাতিক আদালতের রায় বলবৎ হওয়ার পদ্ধতি

  1. রাষ্ট্রের সম্মতি প্রয়োজন:আন্তর্জাতিক আদালতের এখতিয়ার (jurisdiction) রায় বলবৎ করার জন্য রাষ্ট্রকে আগে আদালতের এখতিয়ারে সম্মতি দিতে হয়।অর্থাৎ, কোনো রাষ্ট্র যদি আদালতের রায় মানতে চায় না, আদালত জোর করে তা প্রয়োগ করতে পারে না।
  2. বাধ্যতামূলকতা:একবার আদালত রায় দিলে তা চূড়ান্ত বাধ্যতামূলক।আদালতের রায় মানা আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী রাষ্ট্রের জন্য বাধ্যতামূলক, তবে বাস্তবিকভাবে প্রয়োগ রাষ্ট্রের সদিচ্ছা আন্তর্জাতিক চাপের উপর নির্ভরশীল
  3. বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া: আদালত নিজে রায় জোর করে কার্যকর করতে পারে না।যদি কোনো রাষ্ট্র রায় মানতে অস্বীকার করে, অন্য রাষ্ট্র বা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে।নিরাপত্তা পরিষদ, প্রয়োজন হলে, “সুপারভিশনবা অনুরূপ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে।
  4. পরামর্শমূলক রায় (Advisory Opinion):এটি বাধ্যতামূলক নয়, শুধু আইনগত দিকনির্দেশনা দেয়।রাষ্ট্র বা সংস্থা এটিকে মানলেও মানলেও হয়, তবে এটি আন্তর্জাতিক আইন নীতিমালা বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

 

কোনো ব্যক্তি কি আন্তর্জাতিক আদালতের শরণাপন্ন হতে পারে?

না, কোনো ব্যক্তি সরাসরি আন্তর্জাতিক আদালতের (ICJ) শরণাপন্ন হতে পারে না

নিচে ব্যাখ্যা করা হলো

  1. ICJ-এর এখতিয়ার সীমা:আন্তর্জাতিক আদালত কেবল রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে আইনগত বিরোধ সমাধান করে।ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, কোম্পানি বা কোনো অরাজনৈতিক সংস্থা মামলা করতে পারে না।
  2. ব্যক্তি-নির্ভর মামলা কোথায় হয়:যদি কোনো ব্যক্তির অধিকার লঙ্ঘিত হয় বা অপরাধের অভিযোগ থাকে, তবে সেই মামলা আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত (International Criminal Court – ICC) বা মানবাধিকার আদালত/কমিশন-এর কাছে যেতে হবে।

উদাহরণ: ICC – যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যা বা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের মামলার জন্য।

  1. ICJ-এর ভূমিকা: ব্যক্তির অধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র বা জাতিসংঘ সংস্থা আদালতের কাছে পরামর্শ বা মামলা আনতে পারে, কিন্তু ব্যক্তি নিজে সরাসরি নয়।

No comments

Powered by Blogger.