কীভাবে পণ্য বিক্রয় চুক্তি সম্মতিযুক্ত, দ্বিপাক্ষিক এবং ক্রমবর্ধিষ্ণু? বিক্রয় চুক্তির অধিনে কোন বিশেষ উদ্দেশ্যে সরবরাহকৃত পণ্যের গুণ অথবা উপযুক্ততার ব্যাপারে কোন উহ্য শর্ত নেই এই বিধিটির কোন ব্যতিক্রম আছে কী? একজন অপরিশোধিত বিক্রেতা তার আয়ত্তাধীন পণ্য তৃতীয় ব্যক্তির নিকট পুনবিক্রয় করলে প্রথম ক্রেতা কী কী প্রতিকার পেতে পারেন?
৯।
কীভাবে পণ্য বিক্রয় চুক্তি সম্মতিযুক্ত, দ্বিপাক্ষিক এবং ক্রমবর্ধিষ্ণু? বিক্রয় চুক্তির অধিনে কোন বিশেষ উদ্দেশ্যে সরবরাহকৃত পণ্যের গুণ অথবা উপযুক্ততার ব্যাপারে কোন উহ্য শর্ত নেই এই বিধিটির কোন
ব্যতিক্রম আছে কী? একজন অপরিশোধিত বিক্রেতা তার আয়ত্তাধীন পণ্য তৃতীয় ব্যক্তির নিকট পুনবিক্রয় করলে প্রথম ক্রেতা কী কী প্রতিকার
পেতে পারেন?
১) পণ্য বিক্রয় চুক্তি সম্মতিযুক্ত (Consensual)
পণ্য
বিক্রয় চুক্তি
মূলত
পক্ষদ্বয়ের স্বেচ্ছাসম্মতির উপর
প্রতিষ্ঠিত। অর্থাৎ,
এই
চুক্তির সৃষ্টি
হয়
প্রস্তাব (Offer) এবং গ্রহণ
(Acceptance)-এর
মাধ্যমে। যখন
বিক্রেতা একটি
নির্দিষ্ট পণ্য
নির্দিষ্ট মূল্যে
বিক্রয়ের প্রস্তাব দেন
এবং
ক্রেতা
সেই
প্রস্তাব গ্রহণ
করেন,
তখন
উভয়ের
মধ্যে
একটি
বৈধ
চুক্তির জন্ম
হয়।এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
হলো—চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার
জন্য
পণ্য
তাৎক্ষণিকভাবে হস্তান্তর বা
মূল্য
সঙ্গে
সঙ্গে
পরিশোধ
করা
আবশ্যক
নয়।
কেবলমাত্র উভয়
পক্ষের
সম্মতিই চুক্তির ভিত্তি। একে
আইনগত
ভাষায়
বলা
হয়
“Consensus ad idem” অর্থাৎ
উভয়
পক্ষ
একই
বিষয়ে
একমত
হওয়া।উদাহরণস্বরূপ, যদি
একজন
বিক্রেতা ৫০,০০০ টাকায় একটি
মোটরসাইকেল বিক্রির প্রস্তাব দেন
এবং
ক্রেতা
তা
গ্রহণ
করেন,
তবে
সেই
মুহূর্তেই চুক্তি
সম্পন্ন হয়—যদিও মোটরসাইকেল পরে
সরবরাহ
করা
হবে
এবং
মূল্য
কিস্তিতে দেওয়া
হবে।সুতরাং, পণ্য
বিক্রয় চুক্তি
পক্ষদ্বয়ের সম্মতির ভিত্তিতে গঠিত
হওয়ায় এটি
সম্মতিযুক্ত চুক্তি।
২) পণ্য বিক্রয় চুক্তি দ্বিপাক্ষিক (Bilateral)
পণ্য
বিক্রয় চুক্তি
একটি
দ্বিপাক্ষিক চুক্তি,
কারণ
এতে
উভয়
পক্ষের
উপর
পারস্পরিক দায়িত্ব ও
বাধ্যবাধকতা আরোপিত
হয়।
এখানে
কেবল
এক
পক্ষ
নয়,
উভয়
পক্ষই
একে
অপরের
প্রতি
প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।বিক্রেতার প্রধান
দায়িত্বসমূহ হলো—নির্দিষ্ট পণ্য সরবরাহ করা,পণ্যের মালিকানা হস্তান্তর করা,
চুক্তি
অনুযায়ী গুণগত
মান
বজায়
রাখা।
অন্যদিকে, ক্রেতার দায়িত্বসমূহ হলো—নির্ধারিত মূল্য পরিশোধ করা,পণ্য গ্রহণ করা।অর্থাৎ, বিক্রেতা পণ্য
দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন
এবং
ক্রেতা
মূল্য
পরিশোধের প্রতিশ্রুতি দেন।
এই
পারস্পরিক প্রতিশ্রুতির বিনিময়ই চুক্তির ভিত্তি। যদি
কোনো
এক
পক্ষ
তার
দায়িত্ব পালন
না
করে,
তবে
অন্য
পক্ষ
আইনগত
প্রতিকার চাইতে
পারে।উদাহরণস্বরূপ, যদি
বিক্রেতা পণ্য
সরবরাহ
না
করেন,
তবে
ক্রেতা
ক্ষতিপূরণ দাবি
করতে
পারেন।
আবার
ক্রেতা
মূল্য
পরিশোধ
না
করলে
বিক্রেতা আইনগত
ব্যবস্থা নিতে
পারেন।অতএব, উভয়
পক্ষের
পারস্পরিক বাধ্যবাধকতা থাকায়
পণ্য
বিক্রয় চুক্তি
দ্বিপাক্ষিক প্রকৃতির।
৩) পণ্য বিক্রয় চুক্তি ক্রমবর্ধিষ্ণু বা কার্যসম্পাদনযোগ্য (Executory)
পণ্য
বিক্রয় চুক্তি
অনেক
ক্ষেত্রেই তাৎক্ষণিকভাবে সম্পূর্ণ কার্যকর হয়
না;
বরং
ভবিষ্যতে তার
কার্যসম্পাদন সম্পন্ন হয়।
এই
কারণেই
একে
ক্রমবর্ধিষ্ণু বা
Executory বলা
হয়।যখন চুক্তি
সম্পাদনের পরও
কোনো
কাজ
বাকি
থাকে—যেমন ভবিষ্যতে পণ্য
সরবরাহ
করা,
কিস্তিতে মূল্য
পরিশোধ
করা,
বা
নির্দিষ্ট শর্ত
পূরণের
পর
মালিকানা হস্তান্তর করা—তখন সেটি Executory চুক্তি হিসেবে
বিবেচিত হয়।পণ্য বিক্রয় আইনে
“Sale” এবং
“Agreement to Sell”-এর
মধ্যে
পার্থক্য করা
হয়েছে।“Sale”-এ মালিকানা তাৎক্ষণিকভাবে হস্তান্তরিত হয়।“Agreement
to Sell”-এ
মালিকানা ভবিষ্যতে বা
শর্ত
পূরণের
পর
হস্তান্তরিত হয়।
Agreement to Sell মূলত
একটি
ক্রমবর্ধিষ্ণু চুক্তি,
কারণ
এর
সম্পূর্ণ কার্যকারিতা ভবিষ্যতের উপর
নির্ভরশীল।উদাহরণস্বরূপ, যদি
চুক্তি
হয়
যেআগামী মাসে
১০০
বস্তা
চাল
সরবরাহ
করা
হবে
এবং
মূল্য
তখন
প্রদান
করা
হবে,
তবে
এটি
একটি
ক্রমবর্ধিষ্ণু চুক্তি।সুতরাং, চুক্তির কার্যসম্পাদন ভবিষ্যতে সম্পন্ন হওয়ার
কারণে
পণ্য
বিক্রয় চুক্তি
ক্রমবর্ধিষ্ণু প্রকৃতির।
বিক্রয়
চুক্তির অধিনে কোন বিশেষ উদ্দেশ্যে সরবরাহকৃত পণ্যের গুণ অথবা উপযুক্ততার ব্যাপারে কোন উহ্য শর্ত নেই এই বিধিটির কোন
ব্যতিক্রম আছে কী?
সাধারণ বিধান (Caveat Emptor)
“ক্রেতা সাবধান” (Caveat Emptor) নীতি অনুযায়ী, বিক্রয় চুক্তির অধীনে কোনো পণ্য বিক্রি হলে বিশেষ উদ্দেশ্যে তার গুণ বা উপযুক্ততা সম্পর্কে সাধারণত কোনো উহ্য শর্ত (Implied Condition) থাকে না। অর্থাৎ ক্রেতাই
পণ্য যাচাই করে কিনবেন; পণ্য তার উদ্দেশ্যের জন্য উপযুক্ত কি না—সে
দায় সাধারণত ক্রেতার। তবে এই সাধারণ বিধানের
গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ব্যতিক্রম রয়েছে।
উহ্য শর্ত না থাকার বিধির
ব্যতিক্রমসমূহ
১) বিশেষ উদ্দেশ্য প্রকাশ ও বিক্রেতার দক্ষতার
উপর নির্ভর (Section 16(1))
যদি—ক্রেতা স্পষ্টভাবে বা পরোক্ষভাবে বিক্রেতাকে
তার বিশেষ উদ্দেশ্য জানান, বিক্রেতা ঐ ধরনের পণ্যের
ব্যবসায়ী হন, এবং ক্রেতা বিক্রেতার দক্ষতা ও বিচারের উপর নির্ভর করেন, তবে একটি উহ্য শর্ত সৃষ্টি হয় যে পণ্যটি ঐ
বিশেষ উদ্দেশ্যের জন্য উপযুক্ত হবে।
উদাহরণ:
একজন রোগী চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন নিয়ে ফার্মেসিতে গিয়ে নির্দিষ্ট রোগের জন্য ওষুধ চান। ফার্মাসিস্ট ভুল ওষুধ দিলে তিনি দায়ী হবেন, কারণ ক্রেতা তার দক্ষতার উপর নির্ভর করেছিলেন।
২) ব্যবসায়যোগ্য গুণমান (Merchantable
Quality) — Section 16(2)
যদি কোনো ব্যবসায়ীর কাছ থেকে পণ্য কেনা হয়, তবে একটি উহ্য শর্ত থাকে যে পণ্যটি ব্যবসায়যোগ্য
গুণমানের
(merchantable quality) হবে।
অর্থাৎ—পণ্যটি সাধারণ ব্যবহারের উপযোগী হতে হবে। গোপন ত্রুটি থাকা যাবে না তবে যদি
ক্রেতা নিজে পণ্য পরীক্ষা করেন, তবে যে ত্রুটি সাধারণ
পরীক্ষায় ধরা পড়ে—তার জন্য বিক্রেতা দায়ী থাকবেন না।
৩) বর্ণনা অনুযায়ী বিক্রয় (Sale by
Description) — Section 15
যদি পণ্য বর্ণনা অনুযায়ী বিক্রি হয়, তবে তা অবশ্যই সেই
বর্ণনার সাথে মিল থাকতে হবে।
বর্ণনার সাথে অমিল হলে বিক্রেতা দায়ী হবেন।
৪) নমুনা অনুযায়ী বিক্রয় (Sale by Sample) —
Section 17
যদি নমুনা দেখে পণ্য কেনা হয়, তবে—মূল পণ্য নমুনার সাথে মিল থাকতে হবে কোনো গোপন ত্রুটি থাকা যাবে না
৫) ব্যবসায়িক রীতি বা প্রচলিত প্রথা
কোনো বিশেষ ব্যবসায়িক প্রথা বা রীতির ভিত্তিতে
উহ্য শর্ত থাকতে পারে।
উপসংহার
যদিও সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী বিশেষ উদ্দেশ্যে সরবরাহকৃত পণ্যের গুণ বা উপযুক্ততা সম্পর্কে
কোনো উহ্য শর্ত নেই (Caveat Emptor), তবুও—ক্রেতা যদি বিশেষ উদ্দেশ্য জানান এবং বিক্রেতার দক্ষতার উপর নির্ভর করেন,ব্যবসায়ীর কাছ থেকে পণ্য কেনা হয়,বর্ণনা বা নমুনা অনুযায়ী
বিক্রয় হয়,তাহলে আইনের দৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রম সৃষ্টি হয় এবং বিক্রেতা দায়ী হন।
একজন
অপরিশোধিত বিক্রেতা তার আয়ত্তাধীন পণ্য তৃতীয় ব্যক্তির নিকট পুনবিক্রয় করলে প্রথম ক্রেতা কী কী প্রতিকার
পেতে পারেন?
অপরিশোধিত বিক্রেতা কারা?
যে বিক্রেতা—
·
সম্পূর্ণ
মূল্য পাননি, অথবা
·
বিল/চেক গ্রহণ করলেও তা পরিশোধিত হয়নি—
তিনি অপরিশোধিত বিক্রেতা (Unpaid Seller)
হিসেবে গণ্য হন।
আইন অনুযায়ী অপরিশোধিত বিক্রেতার কিছু অধিকার আছে, যেমন—
·
লিয়েন
(Lien)
·
Transit অবস্থায়
পণ্য বন্ধ করা (Stoppage in Transit)
·
পুনর্বিক্রয়ের
অধিকার (Right of
Resale)
প্রথম ক্রেতার প্রতিকার
এটি নির্ভর করে পুনর্বিক্রয়টি আইনসম্মত না বেআইনি ছিল তার উপর।
(ক) পুনর্বিক্রয় যদি আইনসম্মত হয়
আইনসম্মত পুনর্বিক্রয় হতে পারে—
1. পণ্য নষ্টযোগ্য (Perishable
goods) হলে
2. চুক্তিতে পুনর্বিক্রয়ের অধিকার সংরক্ষিত থাকলে
3. প্রথম ক্রেতাকে যথাযথ নোটিশ দিয়ে মূল্য পরিশোধে ব্যর্থ হলে
এক্ষেত্রে—তৃতীয় ক্রেতা ভালো মালিকানা (Good Title) লাভ করেন।প্রথম ক্রেতা সাধারণত পণ্যের দাবি করতে পারেন না। বিক্রেতা লোকসান হলে প্রথম ক্রেতার কাছ থেকে পার্থক্য আদায় করতে পারেন।লাভ হলে সাধারণত প্রথম ক্রেতা সেই লাভের অংশ দাবি করতে পারেন না
(খ) পুনর্বিক্রয় যদি বেআইনি হয় (নোটিশ ছাড়া বা অধিকার না
থাকা সত্ত্বেও)
যদি বিক্রেতা—যথাযথ নোটিশ না দেন, পুনর্বিক্রয়ের
বৈধ অধিকার না থাকা সত্ত্বেও
বিক্রি করেন ,তাহলে প্রথম ক্রেতার নিম্নলিখিত প্রতিকার থাকতে পারে—
১) ক্ষতিপূরণ (Damages) দাবি
প্রথম ক্রেতা চুক্তিভঙ্গের জন্য ক্ষতিপূরণ চাইতে পারেন।
২) বাজারমূল্য ও চুক্তিমূল্যের পার্থক্য
আদায়
যদি পুনর্বিক্রয়ের ফলে ক্ষতি হয়, তাহলে পার্থক্য দাবি করা যেতে পারে।
৩) নির্দিষ্ট কার্যসম্পাদন (Specific
Performance)
যদি পণ্যটি বিশেষ বা অনন্য (specific goods) হয়, তবে আদালতের মাধ্যমে নির্দিষ্ট কার্যসম্পাদনের আবেদন করা যেতে পারে।
৪) মালিকানা ইতিমধ্যে হস্তান্তরিত হলে
যদি মালিকানা ইতিমধ্যে প্রথম ক্রেতার কাছে হস্তান্তরিত হয়ে থাকে, তবে তিনি তৃতীয় ক্রেতার বিরুদ্ধেও দাবি করতে পারেন (পরিস্থিতিভেদে)।
উপসংহার
সুতরাং, একজন অপরিশোধিত বিক্রেতা তার আয়ত্তাধীন পণ্য তৃতীয় ব্যক্তির নিকট পুনর্বিক্রয় করলে—যদি পুনর্বিক্রয় আইনসম্মত হয়, তবে প্রথম ক্রেতার প্রতিকার প্রায় থাকে না।কিন্তু যদি তা বেআইনি হয়,
তবে প্রথম ক্রেতা ক্ষতিপূরণ, মূল্য পার্থক্য, এমনকি নির্দিষ্ট কার্যসম্পাদনের দাবিও করতে পারেন। অতএব, প্রথম ক্রেতার প্রতিকার সম্পূর্ণরূপে নির্ভর করে বিক্রেতার পুনর্বিক্রয়ের বৈধতার উপর।
No comments