ইঙ্গিতবাহী প্রশ্ন বলতে কী বুঝ? সাক্ষীকে কখন ইঙ্গিতবাহী প্রশ্ন করা যায়? সাক্ষীর বিশ্বাসযোগ্যতা কিভাবে হরণ করা যায়? কি কি কারণে একজন বিচারক এ প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করতে পারেন
৬ (ক) ইঙ্গিতবাহী প্রশ্ন বলতে কী বুঝ? সাক্ষীকে কখন ইঙ্গিতবাহী প্রশ্ন করা যায়? সাক্ষীর বিশ্বাসযোগ্যতা কিভাবে হরণ করা যায়? কি কি কারণে একজন বিচারক এ প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করতে পারেন
ইঙ্গিতবাহী
প্রশ্ন বলতে কী বুঝ?
ইঙ্গিতবাহী প্রশ্ন (Leading Question) বলতে বোঝায় এমন
প্রশ্ন
যা
উত্তরদাতাকে নির্দিষ্টভাবে উত্তর দিতে নির্দেশ বা ইঙ্গিত দেয়। অর্থাৎ, প্রশ্নের মধ্যে
উত্তর
ইতোমধ্যে নিহিত
থাকে। উত্তরদাতার স্বাধীনতা কমে।
সাধারণ
সাক্ষীকে স্বাধীনভাবে প্রশ্ন
করা
হয়
না।
সাধারণত cross-examination বা শিশু/দুর্বল সাক্ষীর ক্ষেত্রে ব্যবহার করা
হয়।
উদাহরণ:
“আপনি কি
দেখেছেন অভিযুক্ত রাত
১০টায়
দোকানে
প্রবেশ
করেছে?”
এখানে
প্রশ্নটি উত্তরকে “হ্যাঁ”
বা
“না”-তে নির্দেশ করছে।
সাক্ষীকে
কখন
ইঙ্গিতবাহী
(Leading) প্রশ্ন
করা
যায়:
সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২ অনুযায়ী সাধারণভাবে প্রধান
সাক্ষীকে
স্বাধীনভাবে
প্রশ্ন
করতে
হবে,
অর্থাৎ ইঙ্গিতবাহী প্রশ্ন সাধারণভাবে ব্যবহার করা যায় না। তবে নিম্নলিখিত
পরিস্থিতিতে
ইঙ্গিতবাহী প্রশ্ন করা অনুমোদিত:
১. Cross-Examination (প্রতিপক্ষের জের)
অভিযুক্ত বা মামলার বিপরীতপক্ষের
সাক্ষীকে জেরা করার সময় ইঙ্গিতবাহী প্রশ্ন ব্যবহার করে সাক্ষীর বক্তব্যের সত্যতা বা অসঙ্গতি পরীক্ষা করা যায়
উদাহরণ:
“আপনি কি দেখেছেন অভিযুক্ত
দোকানে প্রবেশ করেছে?
২. দুর্বল বা শিশু সাক্ষী
সাক্ষীর স্মৃতিশক্তি
সীমিত
বা শিশু হলে তাকে বোঝানোর জন্য বা তথ্য সঠিকভাবে
নেয়ার জন্য ইঙ্গিতবাহী প্রশ্ন ব্যবহার করা যায়
উদাহরণ:
“আপনি কি গতকাল স্কুলে
গিয়েছিলেন?”
৩. পূর্বে দেওয়া সাক্ষ্য পুনঃনিশ্চয়তা করার জন্য
পূর্বে বলা তথ্য নিশ্চিত করার জন্য। সাক্ষীর বক্তব্যের পুনঃনিশ্চয়তা যাচাইয়ের জন্য
উদাহরণ:
“আপনি কি আগে বলেছিলেন
দোকান রাত ৮টায় বন্ধ হয়ে গেছে?”
সাক্ষীর বিশ্বাসযোগ্যতা কিভাবে হরণ করা যায়?
সাক্ষীর
বিশ্বাসযোগ্যতা
(Credibility) হরণ
করা
বা
কমানো
বলতে বোঝায় আদালতে এমন প্রমাণ বা কৌশল দেখানো
যাতে সাক্ষীর
বক্তব্যের
সত্যতা
বা
বিশ্বাসযোগ্যতা
প্রশ্নবিদ্ধ
হয়।
সাক্ষীর বিশ্বাসযোগ্যতা হরণের সাধারণ উপায়গুলো হলো:
১. বিরোধপূর্ণ প্রশ্ন (Contradiction)
সাক্ষীর বক্তব্যের মধ্যে অসঙ্গতি বা বিরোধ
দেখানো।উদাহরণ: সাক্ষী আদালতে বলছে দোকান রাত ১০টায় বন্ধ হয়েছে, কিন্তু পূর্বে দেওয়া বিবৃতিতে বলেছিল রাত ৮টায় বন্ধ হয়েছে।
২. চরিত্র বা খারাপ রেপুটেশন (Character / Reputation)
সাক্ষীর সদাচরণ
বা
সততার
অভাব
আদালতের কাছে প্রমাণ করা।যেমন, সাক্ষী পূর্বে মিথ্যা বলার প্রবণতা বা অপরাধমূলক ইতিহাস
রাখে।
৩. প্রমাণের সাথে অসঙ্গতি (Contradiction by Evidence)
সাক্ষীর বক্তব্যকে প্রমাণ বা দলিলের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ
দেখানো।উদাহরণ: সাক্ষী বলছে সে ঘটনাস্থলে ছিল,
কিন্তু CCTV বা ডকুমেন্ট প্রমাণ
করছে সে সেখানে উপস্থিত
ছিল না।
৪. ইঙ্গিতবাহী প্রশ্নের মাধ্যমে হরণ (Leading Questions / Impeachment)
cross-examination বা
পূর্ব বক্তব্য যাচাই করে সাক্ষীর বক্তব্যে সন্দেহ সৃষ্টি। উদাহরণ: “আপনি কি সত্যিই রাত
১০টায় দোকানে ছিলেন, নাকি পরে?”
কি
কি কারণে একজন বিচারক এ প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ
করতে পারেন বিস্তারিত
বিচারকের হস্তক্ষেপের কারণ
১. অযাচিত
বা
অসঙ্গত
প্রশ্ন
আদালত হস্তক্ষেপ করতে পারে যদি কোনো পক্ষ সাক্ষীর প্রতি এমন প্রশ্ন করে যা অপ্রাসঙ্গিক
বা
অবান্তরঅশ্লীল,
আক্রমণাত্মক
বা
ব্যক্তিগত
আক্রমণমূলক
উদ্দেশ্য: আদালতের প্রক্রিয়ার ন্যায় ও শিষ্টাচার বজায়
রাখা।
উদাহরণ: সাক্ষীকে তার ব্যক্তিগত জীবন বা পরিবার নিয়ে
অযথা জিজ্ঞাসা করা।
২. সাক্ষীর
উপর
প্রলোভন
বা
চাপ
কোনো পক্ষ যদি সাক্ষীর ওপর ভীতি,
হুমকি,
প্রলোভন
বা
চাপ
প্রদর্শন করে,আদালত হস্তক্ষেপ করে যাতে সাক্ষীর স্বাধীন
ও
সঠিক
উত্তর
দেওয়ার
ক্ষমতা
বজায় থাকে।উদাহরণ: আদালতে অভিযুক্ত বা তার পক্ষের
কেউ সাক্ষীর কাছে হুমকি দেয় বা প্রলোভন দেয়।
৩. প্রক্রিয়ার
সুষ্ঠুতা
বজায়
রাখা
বিশেষ করে শিশু, অসুস্থ বা স্মৃতিশক্তি কম
সাক্ষীর ক্ষেত্রে:আদালত প্রশ্নের ধরন বা উপস্থাপনের উপায়
পরিবর্তন করতে পারে। উদ্দেশ্য হলসাক্ষীর বুদ্ধিমত্তা
অনুযায়ী
বোঝানো
এবং
সঠিক
তথ্য
নেওয়া।
৪. আইনের
লঙ্ঘন
রোধ
করা
যদি কোনো প্রশ্ন বা জেরা সাক্ষ্য
আইন,
প্রমাণ
আইন
বা
আদালতের
নিয়ম
লঙ্ঘন
করে,বিচারক হস্তক্ষেপ করে এবং প্রশ্ন বাতিল বা সংশোধনের নির্দেশ
দেন।উদাহরণ: সাক্ষীকে পুলিশ বা আদালতের অনুমতি
ছাড়া কিছু অভিযোগের বিষয়ে বাধ্য করা।
৫. সাক্ষীকে
বিভ্রান্তি
থেকে
রক্ষা
করা
·
প্রশ্নের
প্রক্রিয়া এমন হলে যে সাক্ষী বিভ্রান্ত
হতে পারে, বিচারক হস্তক্ষেপ করে পরিষ্কারভাবে
বোঝানো
বা
পুনঃপ্রশ্ন
করার
ব্যবস্থা
নেন।উদ্দেশ্য: সঠিক ও নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্য
নিশ্চিত করা।
৬. সাক্ষীর
প্রতি
অযাচিত
পুনরাবৃত্তি
প্রতিরোধ
যদি পক্ষপক্ষান্তর করে একই প্রশ্ন বারবার করতে চায়,আদালত হস্তক্ষেপ করে সাক্ষীর
উপর
অযথা
চাপ
বা
ক্লান্তি
প্রতিরোধ
করে।
(খ) প্রশ্ন আইনসম্মত ও প্রাসঙ্গিক হওয়া সত্ত্বেও কখন সাক্ষীকে প্রশ্নের উত্তর দিতে বাধ্য করা যায় না?
১. ভূমিকা
সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২ অনুসারে আদালত সাক্ষীর
কাছে
আইনসম্মত
এবং
প্রাসঙ্গিক
প্রশ্ন
করতে
পারে,
কিন্তু কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে সাক্ষীকে
উত্তর
দেওয়ার
জন্য
বাধ্য
করা
যায়
না,
কারণ এখানে সাক্ষীর
স্বতন্ত্র
অধিকার,
সম্পর্ক
বা
নৈতিক
দিক
বিবেচনা
করা
হয়।
অর্থাৎ, প্রশ্ন প্রাসঙ্গিক হলেও কিছু
বিশেষ
সুরক্ষা
ব্যবস্থা
থাকে যা সাক্ষীকে নির্দিষ্ট
উত্তর দিতে বাধ্য করে না।
২. মূল কারণে সাক্ষীকে উত্তর দিতে বাধ্য করা যায় না
(ক) আত্ম-অভিযোগ বা নিজেকে দোষী
প্রমাণ করার সম্ভাবনা (Protection
against self-incrimination)
কোনো সাক্ষীকে **নিজের বিরুদ্ধে স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য করা যায় না।
উদাহরণ: অভিযুক্তকে জিজ্ঞাসা করা হচ্ছে যে সে চুরি
করেছে কি না → সাক্ষীকে
নিজেকে দোষী প্রমাণ করার জন্য বাধ্য করা যাবে না।
(খ) ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে (Privileged
Relationships)
কিছু সম্পর্কের ক্ষেত্রে আইনগত
গোপনীয়তা
বা
বিশেষ
সুরক্ষা
থাকে।সাক্ষীকে উত্তর দিতে বাধ্য করা যাবে না।
উদাহরণ:
1. স্বামী–স্ত্রী
সম্পর্ক
– স্বামী বা স্ত্রীকে অপরাধমূলক
সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য বাধ্য করা যায় না।
2. আইনজীবী–ক্লায়েন্ট
সম্পর্ক
– ক্লায়েন্টের গোপন তথ্য প্রকাশ করতে বাধ্য করা যাবে না।
3. চিকিৎসক–রোগী
সম্পর্ক
– রোগীর গোপন স্বাস্থ্য তথ্য প্রকাশ বাধ্যতামূলক নয়।
4. পুরোহিত–ধর্মীয়
পরামর্শপ্রদান
সম্পর্ক
– ধর্মীয় বা পরামর্শমূলক তথ্য
প্রকাশ বাধ্য নয়।
(গ) শিশু, অসুস্থ বা মানসিকভাবে অক্ষম
সাক্ষী
যদি সাক্ষীর বয়স,
শারীরিক
বা
মানসিক
অবস্থা
তাকে উত্তর দিতে অক্ষম করে, আদালত তাকে বাধ্য করতে পারে না।
উদাহরণ: শিশু, মানসিকভাবে অক্ষম ব্যক্তি।
(ঘ) প্রমাণ আইন দ্বারা সুরক্ষিত অন্যান্য তথ্য
গোপন
চিঠি,
লিপি
বা
নথি
যা বিশেষভাবে সুরক্ষিত।সাক্ষীকে এগুলো প্রকাশ করতে বাধ্য করা যায় না।
উপসংহার:
No comments