(ক) জনশ্রুতি কোনো সাক্ষ্য নয়’ সংক্ষেপে এ নীতির ব্যতিক্রমসমূহ আলোচনা কর।(খ) প্রশ্ন আইন সম্মত ও প্রাসঙ্গিক হওয়া সত্ত্বেও কখন সাক্ষীকে প্রশ্নের উত্তর দিতে বাধ্য করা যায় না? জেরার সময় আইনসঙ্গতভাবে কী কী প্রশ্ন করা যায়? বর্ণনা কর।(গ)জেরার সময় আইনসঙ্গতভাবে কী কী প্রশ্ন করা যায়? বর্ণনা কর।
২। (ক) ‘জনশ্রুতি কোনো সাক্ষ্য নয়’ সংক্ষেপে এ নীতির ব্যতিক্রমসমূহ
আলোচনা কর।
(খ) প্রশ্ন
আইন
সম্মত
ও
প্রাসঙ্গিক হওয়া
সত্ত্বেও কখন
সাক্ষীকে প্রশ্নের উত্তর
দিতে
বাধ্য
করা
যায়
না?
(গ)
জেরার সময় আইনসঙ্গতভাবে কী কী প্রশ্ন
করা যায়? বর্ণনা কর।
ভূমিকা
সাক্ষ্য আইনের একটি মৌলিক নীতি হলো— “জনশ্রুতি
(Hearsay) কোনো
সাক্ষ্য
নয়”। জনশ্রুতি বলতে
বোঝায় এমন বক্তব্য, যা সাক্ষী নিজে
প্রত্যক্ষভাবে দেখেনি বা শোনেনি; বরং
অন্যের কাছ থেকে শুনে আদালতে উপস্থাপন করে। এ ধরনের সাক্ষ্যের
সত্যতা যাচাই করা কঠিন হওয়ায় সাধারণভাবে তা আদালতে গ্রহণযোগ্য
নয়। তবে ন্যায়বিচারের স্বার্থে এবং বাস্তব প্রয়োজনের কারণে এই নীতির কিছু
স্বীকৃত
ব্যতিক্রম
রয়েছে।
নিচে সংক্ষেপে জনশ্রুতি নীতির ব্যতিক্রমসমূহ আলোচনা করা হলো।
‘জনশ্রুতি কোনো সাক্ষ্য নয়’ নীতির ব্যতিক্রমসমূহ
১. মৃত্যু-উক্তি (Dying Declaration)
যখন কোনো ব্যক্তি মৃত্যুর পূর্বমুহূর্তে তার মৃত্যুর কারণ বা পরিস্থিতি সম্পর্কে
বক্তব্য প্রদান করে, তা জনশ্রুতি হলেও
গ্রহণযোগ্য। কারণ ধারণা করা হয়—মৃত্যুপথযাত্রী ব্যক্তি সাধারণত মিথ্যা বলে না।
২. একই লেনদেনের অংশভুক্ত বক্তব্য (Res Gestae)
ঘটনার সঙ্গে সময়, স্থান ও পরিস্থিতিগতভাবে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কযুক্ত
তাৎক্ষণিক বক্তব্য জনশ্রুতি হলেও গ্রহণযোগ্য।
উদাহরণ:
আক্রমণের সময় ভুক্তভোগীর চিৎকার।
৩. ব্যবসায়িক বা সরকারি নথি
নিয়মিত ব্যবসা বা সরকারি কার্যক্রমের
অংশ হিসেবে রক্ষিত নথিতে থাকা বক্তব্য জনশ্রুতি হলেও সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণযোগ্য।
উদাহরণ:
জন্মনিবন্ধন, মৃত্যুসনদ।
৪. জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট সাধারণ অধিকার বা প্রথা
কোনো সাধারণ অধিকার, রীতি বা প্রথা সম্পর্কিত
জনশ্রুতিভিত্তিক তথ্য অনেক ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য।
উদাহরণ:
গ্রামবাসীর দীর্ঘদিনের ব্যবহার অনুযায়ী রাস্তা ব্যবহারের অধিকার।
৫. মৃত বা অপ্রাপ্য ব্যক্তির
বক্তব্য
যদি কোনো ব্যক্তি মৃত হন বা সাক্ষ্য
দিতে অক্ষম হন এবং তার
পূর্বের বক্তব্য মামলার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত হয়, তবে তা গ্রহণযোগ্য হতে
পারে।
৬. স্বীকৃতি ও স্বীকারোক্তি (Admission and Confession)
পক্ষের স্বীকৃতি বা অভিযুক্তের স্বীকারোক্তি
জনশ্রুতি হলেও তা সাক্ষ্য হিসেবে
গ্রহণযোগ্য, যদি আইনসম্মতভাবে প্রাপ্ত হয়।
৭. পূর্ববর্তী সাক্ষ্য (Former Testimony)
যে ব্যক্তি পূর্বে কোনো বিচারিক কার্যক্রমে সাক্ষ্য দিয়েছে কিন্তু বর্তমানে মৃত বা অপ্রাপ্য, তার
পূর্ববর্তী সাক্ষ্য জনশ্রুতি হলেও গ্রহণযোগ্য হতে পারে।
উপসংহার
যদিও সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী জনশ্রুতি কোনো সাক্ষ্য নয়, তবে ন্যায়বিচার ও বাস্তবতার প্রয়োজনে
সাক্ষ্য আইন এই নীতির কয়েকটি
গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রম স্বীকার করেছে। এসব ব্যতিক্রম আদালতকে সত্য উদ্ঘাটনে সহায়তা করে এবং বিচার ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করে তোলে।
(খ) প্রশ্ন
আইন
সম্মত
ও
প্রাসঙ্গিক হওয়া
সত্ত্বেও কখন
সাক্ষীকে প্রশ্নের উত্তর
দিতে
বাধ্য
করা
যায়
না?
ভূমিকা
বিচারকার্যে সত্য
উদ্ঘাটনের জন্য
সাক্ষীকে জেরা
করা
অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ
নিয়ম
অনুযায়ী কোনো
প্রশ্ন
যদি
আইনসম্মত ও প্রাসঙ্গিক হয়,
তবে
সাক্ষীকে সেই
প্রশ্নের উত্তর
দিতে
বাধ্য
করা
যায়।
তবে
সাক্ষ্য আইন
ন্যায়বিচার ও
ব্যক্তিগত অধিকার
রক্ষার
জন্য
কিছু
ক্ষেত্রে এই
সাধারণ
নিয়মের ব্যতিক্রম স্বীকার করেছে।
ফলে
কিছু
নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে প্রশ্ন
আইনসম্মত ও
প্রাসঙ্গিক হওয়া
সত্ত্বেও সাক্ষীকে উত্তর
দিতে
বাধ্য
করা
যায়
না।
নিচে
সেই
পরিস্থিতিগুলো বিস্তারিতভাবে আলোচনা
করা
হলো।
আইনসম্মত ও প্রাসঙ্গিক প্রশ্নের উত্তর দিতে সাক্ষীকে বাধ্য করা যায় না যখন—
১. আত্মঅভিযোগের ঝুঁকি থাকলে (Privilege against Self-Incrimination)
যদি
কোনো
প্রশ্নের উত্তর
দিলে
সাক্ষী
নিজেকে
অপরাধী
হিসেবে
প্রকাশ
করে
বা
তাকে
ফৌজদারী মামলায় অভিযুক্ত হওয়ার
আশঙ্কা
থাকে,
তবে
সে
প্রশ্নের উত্তর
দিতে
অস্বীকার করতে
পারে।
এটি
সাক্ষীর একটি
সাংবিধানিক ও
আইনগত
অধিকার।
২. রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা ভঙ্গের আশঙ্কা থাকলে
যদি
প্রশ্নের উত্তর
দিলে
রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, জনস্বার্থ বা
সরকারি
গোপন
তথ্য
প্রকাশিত হওয়ার
সম্ভাবনা থাকে,
তবে
সাক্ষীকে উত্তর
দিতে
বাধ্য
করা
যায়
না।
৩. পেশাগত গোপনীয়তার ক্ষেত্রে
কিছু
পেশায়
গোপনীয়তা রক্ষা
বাধ্যতামূলক। যেমন—
আইনজীবী ও
মক্কেলের মধ্যে
যোগাযোগ,
চিকিৎসক ও
রোগীর
গোপন
তথ্য। এ ধরনের
তথ্য
প্রকাশে সাক্ষীকে বাধ্য
করা
যায়
না।
৪. দাম্পত্য যোগাযোগের গোপনীয়তা
স্বামী
ও
স্ত্রীর মধ্যে
বৈবাহিক সম্পর্কে ব্যক্তিগত যোগাযোগ সম্পর্কিত প্রশ্নের উত্তর
দিতে
সাক্ষীকে সাধারণত বাধ্য
করা
যায়
না,
যদি
না
আইন
বিশেষভাবে অনুমতি
দেয়।
৫. সরকারি কর্মকর্তার গোপন তথ্য
কোনো
সরকারি
কর্মকর্তা যদি
মনে
করেন
যে
কোনো
প্রশ্নের উত্তর
দিলে
সরকারি
দায়িত্ব পালনে
বিঘ্ন
ঘটবে
বা
জনস্বার্থ ক্ষুণ্ন হবে,
তবে
তিনি
সেই
প্রশ্নের উত্তর
দিতে
অস্বীকার করতে
পারেন
(আদালতের অনুমতি
সাপেক্ষে)।
৬. অবমাননাকর বা অত্যন্ত ব্যক্তিগত প্রশ্ন
যদিও
প্রশ্ন
প্রাসঙ্গিক হতে
পারে,
কিন্তু
তা
যদি
অশালীন,
অবমাননাকর বা
অপ্রয়োজনীয়ভাবে ব্যক্তিগত হয়
এবং
মামলার
ন্যায়বিচারে অপরিহার্য না
হয়,
তবে
সাক্ষীকে উত্তর
দিতে
বাধ্য
করা
যায়
না।
৭. দণ্ডমূলক বা আর্থিক দায় সৃষ্টির আশঙ্কা থাকলে
যদি
কোনো
প্রশ্নের উত্তরে
সাক্ষীর বিরুদ্ধে জরিমানা, দেওয়ানি দায়
বা
অন্য
কোনো
দণ্ডমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সম্ভাবনা থাকে,
তবে
সে
উত্তর
দিতে
অস্বীকার করতে
পারে।
উপসংহার
সাক্ষ্য আইন
একদিকে
যেমন
সত্য
উদ্ঘাটনের সুযোগ
দেয়,
অন্যদিকে সাক্ষীর মৌলিক
অধিকার
ও
সামাজিক স্বার্থও রক্ষা
করে।
তাই
প্রশ্ন
আইনসম্মত ও
প্রাসঙ্গিক হওয়া
সত্ত্বেও কিছু
নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সাক্ষীকে প্রশ্নের উত্তর
দিতে
বাধ্য
করা
যায়
না।
এসব
ব্যতিক্রম ন্যায়বিচারকে মানবিক
ও
ভারসাম্যপূর্ণ করে
তোলে।
(গ)
জেরার সময় আইনসঙ্গতভাবে কী কী প্রশ্ন
করা যায়? বর্ণনা কর।
ভূমিকা
জেরা
(Cross-examination) হলো
বিচারিক প্রক্রিয়ার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। জেরার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে সাক্ষীর বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করা, তার বিশ্বাসযোগ্যতা পরীক্ষা করা এবং বক্তব্যের মধ্যে অসঙ্গতি বা দুর্বলতা উদ্ঘাটন
করা। এ কারণেই সাক্ষ্য
আইন জেরার সময় প্রশ্ন করার ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে ব্যাপক স্বাধীনতা প্রদান করেছে। তবে এই স্বাধীনতা আইন
দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। জেরার সময় যেসব প্রশ্ন আইনসঙ্গতভাবে
করা
যায়,
তা নিচে বর্ণনা করা হলো।
জেরার সময় আইনসঙ্গতভাবে যে যে প্রশ্ন
করা যায়
১. বিচার্য ঘটনা ও প্রাসঙ্গিক ঘটনার
বিষয়ে প্রশ্ন
সাক্ষীর প্রদত্ত বক্তব্য যে বিচার্য ঘটনা
বা প্রাসঙ্গিক ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত, সে বিষয়ে প্রশ্ন
করা যায়।
উদ্দেশ্য:
সাক্ষীর বক্তব্য সত্য কি না তা
যাচাই করা।
২. লিডিং প্রশ্ন (Leading Questions)
জেরার সময় লিডিং প্রশ্ন করা আইনসঙ্গত। অর্থাৎ এমন প্রশ্ন করা যায়, যার উত্তরের ইঙ্গিত প্রশ্নের মধ্যেই থাকে।
উদাহরণ:
“আপনি ঘটনাটি রাতে দেখেছিলেন, তাই না?”
৩. সাক্ষীর পূর্ববর্তী বক্তব্য সংক্রান্ত প্রশ্ন
সাক্ষী পূর্বে পুলিশ, ম্যাজিস্ট্রেট বা অন্য কোনো
কর্তৃপক্ষের কাছে যে বক্তব্য দিয়েছে,
সেই বক্তব্যের সঙ্গে বর্তমান সাক্ষ্যের মিল বা অমিল সম্পর্কে
প্রশ্ন করা যায়।
৪. সাক্ষীর বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাইয়ের জন্য প্রশ্ন
সাক্ষীর চরিত্র, আচরণ, পূর্বের কার্যকলাপ বা অভ্যাস সম্পর্কে
প্রশ্ন করা যায়, যদি তা সাক্ষীর বিশ্বাসযোগ্যতা
নির্ণয়ে সহায়ক হয়।
৫. সাক্ষীর পক্ষপাত, স্বার্থ বা উদ্দেশ্য সংক্রান্ত
প্রশ্ন
সাক্ষীর কোনো পক্ষের প্রতি পক্ষপাত আছে কি না, মামলার
ফলাফলে তার ব্যক্তিগত স্বার্থ জড়িত আছে কি না—এ
বিষয়ে প্রশ্ন করা যায়।
৬. সাক্ষীর স্মরণশক্তি ও উপলব্ধি যাচাই
সংক্রান্ত প্রশ্ন
সাক্ষী ঘটনাটি কতটা স্পষ্টভাবে দেখেছে, শুনেছে বা মনে রাখতে
পেরেছে—তা যাচাই করার
জন্য প্রশ্ন করা যায়।
উদাহরণ:
দূরত্ব, আলো, সময় ও পরিবেশ সম্পর্কিত
প্রশ্ন।
৭. বক্তব্যের অসঙ্গতি বা স্ববিরোধিতা প্রকাশের
জন্য প্রশ্ন
সাক্ষীর বক্তব্যে কোনো অসঙ্গতি, অতিরঞ্জন বা অস্পষ্টতা থাকলে
তা প্রকাশের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করা যায়।
৮. লিখিত দলিল ও বস্তুগত প্রমাণ
সংক্রান্ত প্রশ্ন
সাক্ষীর সাক্ষ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত দলিল, নথি বা বস্তুগত প্রমাণ
সম্পর্কে প্রশ্ন করা যায়, যাতে সাক্ষ্যের সত্যতা যাচাই করা যায়।
৯. প্ররোচনা বা প্রভাব সংক্রান্ত
প্রশ্ন
সাক্ষীকে কেউ সাক্ষ্য দিতে প্রভাবিত বা প্ররোচিত করেছে
কি না—এ বিষয়ে
প্রশ্ন করা যায়।
১০. পূর্ববর্তী দোষ বা অনৈতিক আচরণ
সংক্রান্ত প্রশ্ন (আইনের সীমার মধ্যে)
সাক্ষীর বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করার জন্য, আইন ও আদালতের শর্ত
সাপেক্ষে, তার পূর্ববর্তী দোষ বা অনৈতিক আচরণ
সম্পর্কে প্রশ্ন করা যায়।
উপসংহার
জেরার সময় আইনসঙ্গতভাবে বিভিন্ন ধরনের প্রশ্ন করা যায়, যার মূল উদ্দেশ্য হলো সাক্ষ্যের সত্যতা ও সাক্ষীর বিশ্বাসযোগ্যতা
যাচাই করা। তবে জেরা অবশ্যই আইন, শালীনতা ও ন্যায়বিচারের সীমার
মধ্যে পরিচালিত হতে হবে। সঠিক ও যুক্তিসংগত জেরা
বিচার প্রক্রিয়ায় সত্য উদ্ঘাটনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
No comments