(ক) সাক্ষ্য আইন অনুযায়ী সাক্ষ্য কী? (খ) বিচারকার্যে সাক্ষ্যের বিভিন্ন প্রকারভেদ কী কী? (গ) সাক্ষ্য আইন প্রয়োগে প্রধান প্রধান নীতি উল্লেখ কর।
৮। (ক) সাক্ষ্য
আইন অনুযায়ী সাক্ষ্য কী?
(খ) বিচারকার্যে সাক্ষ্যের বিভিন্ন প্রকারভেদ কী কী?
(গ) সাক্ষ্য আইন প্রয়োগে প্রধান প্রধান নীতি উল্লেখ কর।
সাক্ষ্য আইন অনুযায়ী, সাক্ষ্য
(Evidence) হলো
আদালতে কোনো ঘটনার সত্যতা বা তথ্য প্রমাণ
করার জন্য প্রদত্ত তথ্য, যা মামলার ন্যায্য
সিদ্ধান্তে সাহায্য করে। সহজ কথায়, সাক্ষ্য
হলো
কোনো
কেসে
সত্য
নির্ধারণের
জন্য
দেওয়া
তথ্য
বা
প্রমাণ।
আইন
অনুযায়ী:
“সাক্ষ্য হলো আদালতের সামনে প্রদত্ত এমন তথ্য যা কোনো বিষয়
বা ঘটনার সত্যতা বা অমিততার প্রমাণ
সরবরাহ করে। মূল লক্ষ্য হলে আদালতকে সত্যের
ওপর
ভিত্তি
করে
রায়
দেওয়ার
সক্ষমতা
প্রদান করা।
বৈশিষ্ট্যঃ
1. প্রমাণাত্মক
তথ্য:
আদালতে প্রমাণের জন্য ব্যবহার করা হয়।
2. প্রত্যক্ষ
বা
পরোক্ষ:
এটি সরাসরি ঘটনার বর্ণনা বা অন্য প্রমাণের
মাধ্যমে প্রদর্শিত হতে পারে।
3. বস্তুনিষ্ঠ
ও
নির্ভরযোগ্য:
আদালত গ্রহণযোগ্যতা যাচাই করে।
4. আইনের
শর্তে
প্রযোজ্য:
সকল সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়—কিছু নিয়ম ও শর্ত পূরণ
করতে হবে।
সাক্ষ্য ধরন
সাক্ষ্যকে সাধারণত দুইভাবে ভাগ করা যায়:
1. প্রত্যক্ষ
সাক্ষ্য
(Direct Evidence):যেটা
সরাসরি ঘটনার সত্যতা প্রমাণ করে।
2. উদাহরণ: কেউ সরাসরি দেখে বা শুনে বলছে
যে, “আমি দেখেছি A চুরির সময় B-এর কাছে হাত
দিয়েছে।
3. পরোক্ষ
সাক্ষ্য
(Circumstantial/Indirect Evidence):সরাসরি না
হলেও, ঘটনার সত্যতা অনুমান করা যায়।
উদাহরণ: কোনো ব্যক্তি অপরাধের সময় জায়গায় ছিল, তার কাপড়ে রক্তের দাগ, মোবাইল ফোনের অবস্থান ইত্যাদি।
বিচারকার্যে
সাক্ষ্যের বিভিন্ন প্রকারভেদ কী কী?
প্রধান প্রকারভেদ (Nature/Type of Evidence): প্রধানত স্বাক্ষীকে প্রধানত ২ ভাগে ভাগ করা যায়
(ক)
প্রত্যক্ষ
সাক্ষ্য
(Direct Evidence)
এমন সাক্ষ্য যা সরাসরি ঘটনার
সত্যতা প্রমাণ করে। ঘটনার সত্যতা প্রমাণ করতে অনুমানের প্রয়োজন হয় না। আদালতে সর্বোচ্চ গ্রহণযোগ্যতা পায়।
উদাহরণ:
প্রত্যক্ষদর্শী বলে, “আমি দেখেছি A B-এর টাকা চুরি
করছে।”
(খ)
পরোক্ষ
সাক্ষ্য
(Circumstantial / Indirect Evidence)
সরাসরি না হলেও, ঘটনার
সত্যতা অনুমানের মাধ্যমে প্রমাণ করা যায়।এককভাবে সরাসরি প্রমাণ না হলেও, একাধিক
পরোক্ষ প্রমাণ একত্রে সত্য প্রমাণ করতে পারে।
উদাহরণ:
অপরাধস্থলে অপরাধীর জুতার ছাপ পাওয়া। মোবাইল ফোনের অবস্থান অনুযায়ী অপরাধের সময় ব্যক্তি সেখানে উপস্থিত ছিল।
প্রদানের ধরন অনুযায়ী (Mode of Evidence)
(ক)
মৌখিক
সাক্ষ্য
(Oral Evidence)
আদালতে শপথের মাধ্যমে মৌখিকভাবে প্রদত্ত তথ্য।প্রমাণের মান নির্ভর করে সাক্ষীর বিশ্বাসযোগ্যতার উপর। উদাহরণ: প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী আদালতে এসে ঘটনা বর্ণনা করছে।
(খ)
লিখিত
সাক্ষ্য
(Documentary Evidence)
নথি, দলিল বা লিখিত প্রমাণ
যা আদালতে জমা দেওয়া হয়।প্রমাণের শক্তি সাধারণত বেশি, বিশেষত সরকারি নথি বা চুক্তি।উদাহরণ: চুক্তি,
রশিদ, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, সরকারি নথি।
উৎস বা ব্যক্তির বিশেষজ্ঞতা অনুযায়ী
(ক)
সাধারণ/সাধারণ
সাক্ষ্য
(Ordinary / Lay Evidence)
সাধারণ মানুষ বা প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণিত তথ্য।
উদাহরণ: কেউ বলে, “আমি দেখেছি X দোকান খুলছে।”
(খ)
বিশেষজ্ঞ
সাক্ষ্য
(Expert Evidence)
বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি যেমন ডাক্তার, প্রকৌশলী, ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ প্রমাণ দেয়।আদালত বিশেষজ্ঞের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার ওপর
নির্ভর করে সিদ্ধান্ত নেয়। উদাহরণ: ডাক্তার রিপোর্ট বা ফরেনসিক বিশ্লেষণ।
(গ)
অতীত
বা
হিয়ার্সে
সাক্ষ্য
(Hearsay Evidence)
অন্যের কথার মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্য।সীমিতভাবে গ্রহণযোগ্য, কারণ এটি সরাসরি প্রমাণ নয়।উদাহরণ: কেউ বলে, “B আমাকে বলেছিল যে X এটা করেছে।”
(গ) সাক্ষ্য আইন প্রয়োগে প্রধান প্রধান নীতি উল্লেখ কর।
সাক্ষ্য আইন প্রয়োগে প্রধান প্রধান নীতি
১.
প্রাসঙ্গিকতার
নীতি
(Principle of Relevance)
আদালত কেবলমাত্র মামলার সঙ্গে সম্পর্কিত সাক্ষ্যই গ্রহণ করে।প্রাসঙ্গিকতার
মানদণ্ড: সাক্ষ্য কি ঘটনা বা
দাবির সত্যতা প্রমাণ করতে সহায়ক?অপ্রাসঙ্গিক সাক্ষ্য আদালতে বিভ্রান্তিকর বা ক্ষতিকর হতে
পারে।
উদাহরণ:
চুরির মামলায় অভিযুক্তকে জায়গায় দেখার সাক্ষ্য প্রাসঙ্গিক; তার ব্যক্তিগত জীবন বা আগের মামলার
তথ্য অপ্রাসঙ্গিক।
২.
সত্যনিষ্ঠার
নীতি
(Principle of Truthfulness)
সাক্ষীকে
আদালতের
শপথে
সত্য
বলার
জন্য
বাধ্য
করা
হয়।মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে আইনি শাস্তি বা জুরিপ্রতিরোধ বিধান
থাকে।সাক্ষ্য প্রমাণের মান নির্ভর করে সাক্ষীর
সততার
ওপর।
উদাহরণ:
আদালতে সাক্ষী শপথ করে বলে, “আমি সত্য বলব, অন্য কিছু নয়।”
৩
প্রত্যক্ষ
জ্ঞান
বা
পর্যবেক্ষণের
নীতি
(Principle of Personal Knowledge / Observation)
·
সাক্ষীকে
শুধুমাত্র
সেই
ঘটনার
সাক্ষ্য
দেওয়ার
অনুমতি
আছে
যা
সে
নিজে
দেখেছে,
শুনেছে
বা
অভিজ্ঞ
হয়েছে।
·
অনুমান
বা গুজবের ওপর সাক্ষ্য দেওয়া যায় না।
·
উদাহরণ:
প্রত্যক্ষদর্শী চুরি দেখেছে, সে সাক্ষ্য দিতে
পারে; অন্যের কথা বা রটনায় ভিত্তি
করে সরাসরি অভিযোগ করা যাবে না।
৪.
প্রমাণের
ভার
নীতি
(Doctrine of Burden of Proof)
যিনি
মামলা
করেছেন,
তার
উপর
প্রমাণের
দায়িত্ব।
অভিযোগকারী:
অপরাধ বা দাবির সত্যতা
প্রমাণ করবে।
প্রতিবাদী:
নির্দিষ্ট প্রতিকার বা সুরক্ষা প্রমাণ
করতে পারে।
উদাহরণ:
চুরির মামলায় অভিযোগকারী প্রমাণ করবে অভিযুক্ত আসলেই চুরি করেছে; অভিযুক্ত প্রমাণ করতে পারে সে নির্দোষ।
৫.অবজেক্টিভ
ও
নিরপেক্ষ
নীতি
(Principle of Objectivity / Impartiality)
আদালতকে পক্ষপাতমুক্ত
ও
অবজেক্টিভ
হতে হবে।রায় শুধুমাত্র প্রমাণ
ও
আইন
অনুযায়ী
দেওয়া হয়, ব্যক্তিগত মতামত বা পক্ষপাতের ওপর
নয়।
উদাহরণ:
প্রমাণের ভিত্তিতে রায় দেয়া; বিচারক কোন পক্ষের প্রতি সহমর্মী নয়।
৬.
প্রত্যক্ষ
ও
পরোক্ষ
প্রমাণের
নীতি
(Principle of Direct vs Circumstantial Evidence)
প্রত্যক্ষ
সাক্ষ্য:
সরাসরি সত্য প্রমাণ করে।
পরোক্ষ
সাক্ষ্য:
অনুমান বা পরিস্থিতি থেকে
সত্য প্রমাণ।একত্রে ব্যবহারে মামলা দৃঢ়ভাবে প্রমাণিত হয়।
উদাহরণ:
প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য + জুতার ছাপ + মোবাইল ফোনের অবস্থান একত্রে অপরাধ প্রমাণ করতে ব্যবহার করা।
৭.
বিশেষজ্ঞ
সাক্ষ্য
নীতি
(Principle of Expert Evidence)
বিশেষজ্ঞের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য তাদের
দক্ষতা
ও
অভিজ্ঞতার
ওপর
ভিত্তি
করে।আদালত বিশেষজ্ঞের মতামতকে সরাসরি প্রমাণ হিসেবে নেয় না, বরং বিবেচনা করে।
উদাহরণ:
ডাক্তার বা ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ
বলছে, “মৃত্যু আঘাতের কারণে হয়েছে।”
৮
সতর্কতার
নীতি
(Principle of Caution)
বিশেষ
ক্ষেত্রে
অতিরিক্ত
সতর্কতার
প্রয়োজন।যেমন: শিশুর সাক্ষ্য, অস্পষ্ট সাক্ষী, স্বার্থপর সাক্ষী বা সন্দেহজনক প্রত্যক্ষদর্শী।আদালত
যাচাই ও পরীক্ষা করে
সিদ্ধান্ত নেয়।
উদাহরণ:
শিশুর সাক্ষ্য সরাসরি রায়ের ভিত্তি নয়, যাচাই ও পর্যালোচনার পর
গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়।
৯.ন্যায্য
নির্ভরতার
নীতি
(Principle of Fair Reliance)
সাক্ষ্য যে পক্ষের ওপর
প্রমাণ নির্ভর করছে, সে পক্ষ নির্ভরযোগ্য
প্রমাণ উপস্থাপন করবে।আদালত একপক্ষের
দাবি
যাচাই
করে
প্রতিপক্ষকে ন্যায়সঙ্গত সুযোগ দেয়।
উদাহরণ:
অভিযুক্তের পক্ষ আদালতে তার অখণ্ডতা প্রমাণ করতে পারে, আদালত তা বিবেচনা করবে।
১০. সমন্বয়
ও
সামগ্রিক
যাচাই
নীতি
(Principle of Corroboration / Evaluation)
আদালত একাধিক সাক্ষ্য এবং প্রমাণের মধ্যে সঙ্গতি
বা
মিল
খুঁজে রায় দেয়।কোন সাক্ষ্য এককভাবে অপ্রমাণিত হলেও, অন্যান্য সাক্ষ্য ও প্রমাণের সঙ্গে
মিলিয়ে সত্য প্রমাণ করা যায়।
·
উদাহরণ:
প্রত্যক্ষ সাক্ষী, লিখিত দলিল ও পরোক্ষ প্রমাণ
একত্রে চুরির সত্যতা স্থাপন করে।
১১.ন্যায্যতার
নীতি
(Principle of Equity / Justice)
আদালতের সিদ্ধান্ত সবসময় ন্যায়সঙ্গত
ও
ন্যায্য
হতে হবে।সাক্ষ্য গ্রহণের সময় পক্ষগুলোর সমান সুযোগ নিশ্চিত করা হয়।
উদাহরণ:
কোন পক্ষকে সাক্ষ্য দেওয়ার সুযোগ না দিলে, তা
রায়ের জন্য ন্যায্য হবে না।
No comments