পেটেন্ট কী? পেটেন্টের জন্য আবশ্যকীয় উপাদানগুলো কী কী? পেটেন্টের মাধ্যমে কী ধরনের নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়ে থাকে? বাধ্যতামূলক লাইসেন্স কী? পেটেন্টের ক্ষেত্রে কখন বাধ্যতামূলক লাইসেন্স প্রদান করা হয়?
(ক)
পেটেন্ট কী? পেটেন্টের জন্য আবশ্যকীয় উপাদানগুলো কী কী? পেটেন্টের
মাধ্যমে কী ধরনের নিশ্চয়তা
প্রদান করা হয়ে থাকে?
খ) বাধ্যতামূলক লাইসেন্স কী? পেটেন্টের ক্ষেত্রে কখন বাধ্যতামূলক লাইসেন্স প্রদান করা হয়?
পেটেন্টের সংজ্ঞা
পেটেন্ট হলো সরকার প্রদত্ত একচেটিয়া অধিকার, যা কোনো ব্যক্তি
বা সংস্থাকে নতুন উদ্ভাবন, যন্ত্র, প্রক্রিয়া বা প্রযুক্তি তৈরি
করলে তাকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সেই উদ্ভাবন একচেটিয়াভাবে ব্যবহার, উৎপাদন বা বিক্রি করার অধিকার দেয়।
পেটেন্টের জন্য আবশ্যকীয় উপাদানগুলো কী কী
ভূমিকা
পেটেন্ট হলো নতুন উদ্ভাবনের জন্য সরকার প্রদত্ত একচেটিয়া আইনি অধিকার। কিন্তু প্রতিটি
উদ্ভাবনই পেটেন্টযোগ্য নয়। পেটেন্ট পাওয়ার জন্য কিছু আবশ্যকীয় বৈশিষ্ট্য বা উপাদান থাকতে হবে, যা আইনের দৃষ্টিকোণ
থেকে প্রয়োজনীয়।
পেটেন্টের জন্য আবশ্যকীয় উপাদান
১. নতুনত্ব (Novelty)
·
উদ্ভাবনটি
অবশ্যই নতুন হতে হবে।
·
অর্থাৎ
পূর্বে প্রকাশ বা ব্যবহার করা হয়েছে কিনা তা গুরুত্বপূর্ণ।
·
উদাহরণ:
নতুন ধরনের ইলেকট্রনিক যন্ত্র বা নতুন ওষুধের
সূত্র।
২. উদ্ভাবনযোগ্যতা / ব্যবহারিকতা (Inventive
Step / Non-obviousness)
·
উদ্ভাবনটি
সাধারণ জ্ঞান বা অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সহজে উদ্ভাবনযোগ্য নয়।
·
উদ্ভাবককে
সৃজনশীল চিন্তা প্রয়োগ করতে হবে।
৩. ব্যবহারযোগ্যতা / কার্যকারিতা (Industrial
Applicability / Utility)
·
উদ্ভাবনটি
কার্যকর এবং ব্যবহারযোগ্য হতে হবে, অর্থাৎ শিল্প বা দৈনন্দিন জীবনে
প্রয়োগযোগ্য।
·
উদাহরণ:
নতুন ধরনের জলপরিশোধন প্রক্রিয়া বা যন্ত্রপাতি।
৪. আইনি সীমানার মধ্যে থাকা (Patentable Subject
Matter)
·
উদ্ভাবন
আইন অনুযায়ী পেটেন্টযোগ্য হতে হবে।
·
সাধারণভাবে
পেটেন্টযোগ্য নয়:
o
প্রাকৃতিক
আবিষ্কার (যেমন নতুন ফুলের প্রজাতি, প্রাকৃতিক ধাতু)
o
বৈজ্ঞানিক
তত্ত্ব বা গাণিতিক সূত্র
o
সাহিত্য
বা কপিরাইটযুক্ত কাজ
৫. সম্পূর্ণ প্রকাশ (Full Disclosure)
·
উদ্ভাবনটি
সঠিকভাবে প্রকাশ করা হবে, যাতে অন্য কেউ এটি পুনরায় তৈরি করতে পারে না বা আইনি
অধিকার সুস্পষ্ট হয়।
·
এটি
“পেটেন্ট আবেদন” এর অংশ।
পেটেন্টের মাধ্যমে কী ধরনের নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়ে থাকে?
ভূমিকা
পেটেন্ট হলো নতুন উদ্ভাবনের জন্য সরকার প্রদত্ত একচেটিয়া অধিকার। উদ্ভাবক তার
সৃজনশীলতা বাজারে উপস্থাপন করার সময় অন্য কেউ তা কপি বা ব্যবহার করতে না পারে সেই নিশ্চয়তা পায়। এটি উদ্ভাবককে আইনি সুরক্ষা, বাজারে স্বাতন্ত্র্য এবং ব্যবসায়িক সুবিধা প্রদান করে।
পেটেন্টের মাধ্যমে প্রদত্ত নিশ্চয়তার ধরন
১. একচেটিয়া ব্যবহার অধিকার (Exclusive Rights)
·
উদ্ভাবক
পেটেন্ট পাওয়ার পর নির্দিষ্ট সময়ের জন্য (সাধারণত ২০ বছর) একচেটিয়াভাবে
উদ্ভাবন ব্যবহার, উৎপাদন বা বিক্রি করতে পারে।
·
অন্য
কেউ অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করতে পারবে না।
২. বাজারে প্রতিযোগিতা থেকে সুরক্ষা (Protection from
Competition)
·
পেটেন্টের
মাধ্যমে উদ্ভাবক প্রতিযোগীদের অননুমোদিত কপি বা ব্যবহার থেকে সুরক্ষা পায়।
·
এটি
উদ্ভাবকের বাজারে স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখে।
৩. আইনি সুরক্ষা (Legal Protection)
·
যদি
কেউ উদ্ভাবন অননুমোদিতভাবে ব্যবহার বা কপি করে, উদ্ভাবক আইনি ব্যবস্থা নিতে পারে।
·
আদালতের
মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ বা ব্যবহার বন্ধ
করা সম্ভব।
৪. উদ্ভাবকত্বের স্বীকৃতি (Recognition of
Innovation)
·
পেটেন্ট
হলো সরকারি স্বীকৃতি যে এটি একটি
নতুন, ব্যবহারযোগ্য এবং সৃজনশীল উদ্ভাবন।
·
এটি
উদ্ভাবককে বৈজ্ঞানিক ও শিল্প ক্ষেত্রে মর্যাদা প্রদান করে।
৫. আর্থিক ও বাণিজ্যিক সুবিধা
(Economic & Commercial Benefit)
·
উদ্ভাবক
লাইসেন্সিং বা বিক্রয় করে আর্থিক লাভ অর্জন করতে পারে।
·
পেটেন্ট
ব্যবসায়িক মূলধন হিসেবে কাজ করে।
·
খ)
বাধ্যতামূলক লাইসেন্স কী? পেটেন্টের ক্ষেত্রে কখন বাধ্যতামূলক লাইসেন্স প্রদান করা হয়?
খ) বাধ্যতামূলক লাইসেন্স কী? পেটেন্টের ক্ষেত্রে কখন বাধ্যতামূলক লাইসেন্স প্রদান করা হয়?
বাধ্যতামূলক
লাইসেন্স
(Compulsory License) হলো:
সরকার কর্তৃক প্রদত্ত অনুমতি, যার মাধ্যমে পেটেন্টাধিকারীকে অনুমতি ছাড়াই অন্যকে পেটেন্টকৃত উদ্ভাবন ব্যবহার, উৎপাদন বা বিক্রি করার সুযোগ দেওয়া হয়, সাধারণ জনগণের স্বার্থ বা বিশেষ সামাজিক কারণে।
বৈশিষ্ট্য
1. সরকারি হস্তক্ষেপ: লাইসেন্স দেয়া হয় সরকারি নির্দেশে, উদ্ভাবক স্বেচ্ছায় নয়।
2. জনস্বার্থে: সাধারণত জনগণের জন্য পণ্য সহজলভ্য করতে বা স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক কারণে।
3. সীমিত সময়: এই লাইসেন্স সাধারণত
সীমিত সময়ের জন্য প্রদান করা হয়।
4. মূল্য ও শর্ত: লাইসেন্সপ্রাপ্ত ব্যক্তি পেটেন্টাধিকারীর কাছে মাপসই রয়্যালটি বা ফি প্রদান করে।
·
ওষুধ
খাতে, যেখানে পেটেন্টধারী কোম্পানি অত্যধিক মূল্য নির্ধারণ করছে, সরকার বাধ্যতামূলক লাইসেন্স দিয়ে সস্তা ওষুধ উৎপাদন ও সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারে।
·
নতুন
প্রযুক্তি বা কৃষি উদ্ভাবন,
যা জনগণের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে বাধ্যতামূলক লাইসেন্স দেয়া হয়।
পেটেন্টের ক্ষেত্রে কখন বাধ্যতামূলক লাইসেন্স প্রদান করা হয়?
ভূমিকা
পেটেন্টধারক উদ্ভাবনকে একচেটিয়াভাবে ব্যবহার করার অধিকার পান। তবে কখনও কখনও এই একচেটিয়া অধিকার
সাধারণ জনগণের স্বার্থে সীমিত করা হয়। এই সময়
সরকার বাধ্যতামূলক লাইসেন্স (Compulsory
License) দেয়।
এটি নিশ্চিত করে যে জনগণ প্রয়োজনীয় পণ্য বা উদ্ভাবন সহজলভ্য ও গ্রহণযোগ্য মূল্যে পায়।
বাধ্যতামূলক লাইসেন্স প্রদানের শর্ত
পেটেন্ট আইনের বিভিন্ন দেশের ধারার সাথে মিল রেখে সাধারণ শর্তগুলো হলো:
1. পেটেন্টের যথাযথ ব্যবহার না হওয়া (Non-working of the
patent)
o
যদি
উদ্ভাবন বা পেটেন্টকৃত প্রযুক্তি
দেশে ব্যবহার করা না হয় বা উৎপাদিত না হয়, সরকার বাধ্যতামূলক লাইসেন্স দিতে পারে।
2. উচ্চ মূল্য বা অপ্রাপ্যতা (Reasonable
Price / Non-availability)
o
যদি
পেটেন্টধারী উচ্চ মূল্য ধার্য করে বা পণ্য সহজলভ্য না করে, জনগণের স্বার্থে লাইসেন্স প্রদান করা হয়।
3. জনস্বাস্থ্য বা জনকল্যাণ (Public Health /
Public Interest)
o
ওষুধ
বা প্রযুক্তি যা জনস্বাস্থ্য বা নিরাপত্তার জন্য জরুরি, সেখানে বাধ্যতামূলক লাইসেন্স দেয়া হয়।
4. অন্য ব্যক্তি বা কোম্পানির অক্ষমতা (Lack of Working
by Others)
o
যদি
দেশীয় উৎপাদক পণ্য উৎপাদন করতে না পারে, সরকার অন্যকে লাইসেন্স প্রদান করতে পারে।
5. দূরত্ব বা ভৌগোলিক কারণে প্রয়োজন (Geographical
Requirement)
o
পেটেন্টকৃত
উদ্ভাবন দেশে ব্যবহারের জন্য প্রযোজ্য না হলে, বাধ্যতামূলক লাইসেন্স দেওয়া হয়।
উদাহরণ
·
ভারত:
2012 সালে নতুন ক্যান্সারের ওষুধের জন্য বাধ্যতামূলক লাইসেন্স প্রদানের ঘটনা।
·
যেখানে
কোম্পানি ওষুধটির দাম অত্যধিক রাখছিল এবং সাধারণ জনগণ তা কিনতে পারছিল
না।
জনগণের জন্য পেটেন্টকৃত উদ্ভাবন সহজলভ্য ও গ্রহণযোগ্য মূল্যে নিশ্চিত করা।
অথবা
প্যাটেন্ট আইনের উদ্দেশ্য কি? প্যাটেন্ট প্রদানের জন্য কে আবেদন করতে পারেন? প্যাটেন্ট প্রদানের পদ্ধতি আলোচনা কর। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে প্যাটেন্ট আইনের ভূমিকা ব্যাখ্যা কর ।
প্যাটেন্ট আইনের উদ্দেশ্য কি
ভূমিকা
পেটেন্ট আইন হলো একটি বৈদেশিক ও জাতীয় উদ্ভাবন সুরক্ষা আইন, যা উদ্ভাবককে তার
নতুন উদ্ভাবনের জন্য আইনি অধিকার ও স্বীকৃতি দেয়। এই আইনের মূল
লক্ষ্য হলো উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিকে উৎসাহিত করা, শিল্প ও অর্থনীতির উন্নয়ন এবং জনসাধারণের স্বার্থ রক্ষা করা।
পেটেন্ট আইনের মূল উদ্দেশ্য
১. উদ্ভাবককে স্বীকৃতি ও সুরক্ষা দেওয়া
·
উদ্ভাবক
বা কোম্পানি যখন নতুন উদ্ভাবন বা প্রযুক্তি তৈরি
করে, আইনি সুরক্ষা পায়, যাতে কেউ তার উদ্ভাবন কপি করতে না পারে।
·
উদ্ভাবকের
সৃজনশীলতা উৎসাহিত হয়।
২. উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি উন্নয়নকে
উৎসাহিত করা
·
পেটেন্ট
আইন নতুন গবেষণা ও উদ্ভাবনের জন্য
প্ররোচনা সৃষ্টি করে, কারণ উদ্ভাবক জানে তার উদ্ভাবন নিরাপদ।
৩. শিল্প ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন
·
পেটেন্টকৃত
উদ্ভাবন শিল্প, প্রযুক্তি ও বাণিজ্যে নতুন
সুযোগ তৈরি করে।
·
রয়্যালটি,
লাইসেন্সিং
ও ব্যবসায়িক সুযোগ বাড়িয়ে অর্থনীতিতে অবদান রাখে।
৪. জনস্বার্থ ও সুনির্দিষ্ট ব্যবহার
নিশ্চিত করা
·
উদ্ভাবক
একচেটিয়াভাবে উদ্ভাবন ব্যবহার করতে পারলেও, জনগণের স্বার্থে বাধ্যতামূলক লাইসেন্সের মাধ্যমে সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়।
·
উদাহরণ:
ওষুধ বা গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি
সহজলভ্য করা।
৫. বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত জ্ঞানের
প্রকাশ
·
পেটেন্ট
আবেদনের সময় উদ্ভাবন সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করতে হয়, যা ভবিষ্যতে নতুন
উদ্ভাবনের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।
পেটেন্ট প্রদানের জন্য কে আবেদন করতে পারেন
ভূমিকা
পেটেন্ট হলো নতুন উদ্ভাবনের জন্য সরকার প্রদত্ত একচেটিয়া আইনি অধিকার। কিন্তু প্রতিটি
উদ্ভাবক বা প্রতিষ্ঠান নিজে
পেটেন্টের জন্য আবেদন করতে পারে না। আইন অনুযায়ী কেবলমাত্র নির্দিষ্ট যোগ্যতা সম্পন্ন ব্যক্তি বা সংস্থা আবেদন করতে পারে।
পেটেন্টের জন্য আবেদনকারী
১. উদ্ভাবক (Inventor)
·
যে
ব্যক্তি সৃজনশীলভাবে নতুন উদ্ভাবন বা প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে, সে নিজেই পেটেন্টের
জন্য আবেদন করতে পারে।
·
উদাহরণ:
নতুন যন্ত্র, ওষুধ, বা প্রযুক্তি তৈরি
করা ব্যক্তি।
২. উদ্ভাবকের নিয়োগকৃত ব্যক্তি বা সংস্থা
·
উদ্ভাবক
যদি চায়, তিনি অন্যকে (যেমন সংস্থা বা এজেন্ট) আবেদন করার জন্য অনুমতি দিতে পারেন।
·
আইন
অনুযায়ী উদ্ভাবকের লিখিত অনুমতি আবশ্যক।
৩. প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা
·
যদি
উদ্ভাবনটি কোনো প্রতিষ্ঠানে তৈরি হয়, পেটেন্টের জন্য আবেদন করতে পারে প্রতিষ্ঠানটি।
·
উদাহরণ:
বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান বা কর্পোরেশন।
৪. উত্তরাধিকারী বা অধিকার প্রাপ্ত
ব্যক্তি
·
পেটেন্টধারকের
মৃত্যুর পর তার উত্তরাধিকারী বা অনুমোদিত ব্যক্তি পেটেন্টের জন্য আবেদন করতে পারে।
No comments