ন্যায্য ও ন্যায়পরতার ভিত্তিতে একটি কোম্পানি গুটিয়ে ফেলার অর্থ কী? বাধ্যতামূলক অবসায়নের পদ্ধতি ও ফলাফল আলোচনা কর। সদস্যদের স্বেচ্ছাকৃত অবসায়ন এবং পাওনাদারদের স্বেচ্ছাকৃত অবসায়নের পার্থক্য নির্ণয় কর। অফিসিয়াল লিকুইডেটরের কর্তব্য কী?
১২। ন্যায্য ও ন্যায়পরতার ভিত্তিতে
একটি কোম্পানি গুটিয়ে ফেলার অর্থ কী? বাধ্যতামূলক অবসায়নের পদ্ধতি ও ফলাফল আলোচনা
কর। সদস্যদের স্বেচ্ছাকৃত অবসায়ন এবং পাওনাদারদের স্বেচ্ছাকৃত অবসায়নের পার্থক্য নির্ণয় কর। অফিসিয়াল লিকুইডেটরের কর্তব্য কী?
ন্যায্য ও ন্যায়পরতার ভিত্তিতে
কোম্পানি গুটিয়ে ফেলার অর্থ
সংজ্ঞা:
যখন একটি কোম্পানিকে আইনানুগ এবং ন্যায়পর উপায়ে তার কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা হয়, অর্থাৎ কোম্পানি ব্যবসা চালানো বন্ধ করে তার সম্পদ বিক্রি করে পাওনাদার ও শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে বিতরণ
করে, তখন তাকে “ন্যায্য ও ন্যায়পরতার ভিত্তিতে
গুটিয়ে ফেলা” বলা হয়।
মূল দিকসমূহ:
1. ন্যায্যতা (Fairness):
কোম্পানি বন্ধ করার প্রক্রিয়া এমনভাবে করা হয় যাতে কোনো সদস্য বা পাওনাদারের স্বার্থ
ক্ষুণ্ণ না হয়।
2. ন্যায়পরতা (Justice):
লিকুইডেশনের মাধ্যমে সকল দায়-দেন মেটানো হয় এবং অবশিষ্ট সম্পদ শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে বিতরণ করা হয়।
3. অর্থাৎ: এটি কোম্পানিকে আইনসিদ্ধভাবে এবং ন্যায়পরভাবে সম্পূর্ণ বন্ধ করা।
সহজভাবে বললে, কোম্পানি আর ব্যবসা করবে
না, সম্পদ বিক্রি হবে, পাওনাদার ও শেয়ারহোল্ডাররা তাদের পাওনা
বা অংশ পাবেন – সবকিছু ন্যায্য ও ন্যায়পরভাবে সম্পন্ন হবে।
বাধ্যতামূলক
অবসায়নের পদ্ধতি ও ফলাফল আলোচনা
কর।
১. বাধ্যতামূলক অবসায়নের পদ্ধতি (Procedure of
Compulsory Winding Up)
বাধ্যতামূলক অবসায়ন হল আদালতের হস্তক্ষেপে
কোম্পানি বন্ধ করার প্রক্রিয়া। ধাপগুলো হলো:
1. আবেদন দাখিল করা
আবেদন করতে পারে:
§ শেয়ারহোল্ডার – যদি কোম্পানির পরিচালনায় গুরুতর সমস্যা থাকে
§ ক্রেডিটর – যদি কোম্পানি তাদের পাওনা দিতে অক্ষম
§ সরকারি কর্তৃপক্ষ/রেজিস্ট্রার – কোম্পানি আইন ভঙ্গ করলে
2. আদালতের শুনানি ও আদেশ: আদালত প্রমাণ যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেয়।প্রয়োজনে কোম্পানিকে গুটিয়ে দেওয়ার আদেশ দেয়।
3. অফিসিয়াল লিকুইডেটর নিয়োগ আদালত কোম্পানির লিকুইডেশন সম্পন্ন করার জন্য লিকুইডেটর নিয়োগ করে।
লিকুইডেটরের
কাজ:
§ কোম্পানির সম্পদ সনাক্ত ও সংগ্রহ করা
§ দায় পরিশোধ করা
§ অবশিষ্ট অর্থ শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে বিতরণ করা
4. সম্পদ বিক্রি ও দায় মেটানো:কোম্পানির সমস্ত সম্পদ বিক্রি করা হয়।ক্রেডিটরদের পাওনা প্রথমে মেটানো হয়।
5. লিকুইডেশন রিপোর্ট ও কোম্পানির বন্ধ ঘোষণা: লিকুইডেটর চূড়ান্ত রিপোর্ট আদালতে জমা দেন।কোম্পানির নাম রেজিস্ট্রি থেকে মুছে দেওয়া হয়।কোম্পানি আইনত বন্ধ হয়ে যায়।
২. বাধ্যতামূলক অবসায়নের ফলাফল (Consequences)
1. কোম্পানির অস্তিত্ব শেষ:কোম্পানি আর আইনত বিদ্যমান
থাকে না।
2. দায় পরিশোধ:সমস্ত ক্রেডিটররা তাদের পাওনা পান।
3. শেয়ারহোল্ডারদের অধিকার শেষ:অবশিষ্ট অর্থ ছাড়া শেয়ারহোল্ডারদের আর কোনো অধিকার
থাকে না।
4. লিকুইডেটরের নিয়ন্ত্রণ:কোম্পানির সব সম্পদ ও
কার্যক্রম লিকুইডেটরের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।
5. সম্পূর্ণ লিকুইডেশন: দায় পরিশোধ, সম্পদ বিক্রি ও অর্থ বিতরণের
পর কোম্পানির নাম রেজিস্ট্রি থেকে মুছে যায়।
পরিশেষে, বাধ্যতামূলক
অবসায়ন হলো আদালতের হস্তক্ষেপে কোম্পানি গুটিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া, যা নিশ্চিত করে
দায় পরিশোধ, সম্পদ ন্যায্য বিতরণ এবং কোম্পানির আইনত বন্ধ হওয়া।
সদস্যদের স্বেচ্ছাকৃত
অবসায়ন এবং
পাওনাদারদের স্বেচ্ছাকৃত
অবসায়নের পার্থক্য
নির্ণয় কর।
|
বিষয় |
সদস্যদের স্বেচ্ছাকৃত অবসায়ন (Members’ Voluntary Winding Up) |
পাওনাদারদের স্বেচ্ছাকৃত অবসায়ন (Creditors’ Voluntary Winding Up) |
|
কোম্পানির আর্থিক অবস্থা |
Solvent, অর্থাৎ কোম্পানি সমস্ত দায় মেটাতে সক্ষম। |
Insolvent, অর্থাৎ কোম্পানি সমস্ত দায় মেটাতে সক্ষম নয়। |
|
কোন পদ্ধতি অনুসরণ হয় |
শেয়ারহোল্ডাররা সিদ্ধান্ত নেয়। |
ক্রেডিটর ও
শেয়ারহোল্ডার উভয়কে জড়িয়ে প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। |
|
আবশ্যকতা |
শেয়ারহোল্ডারের বিশেষ রেজোলিউশন দরকার (সাধারণত ৭
দিনের নোটিশের সাথে)। |
ক্রেডিটরের সম্মতি প্রয়োজন। শেয়ারহোল্ডারের প্রস্তাবের ভিত্তিতে ক্রেডিটররা অনুমোদন দেয়। |
|
লিকুইডেটরের নিয়োগ |
সাধারণত শেয়ারহোল্ডারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নিয়োগ। |
ক্রেডিটরদের অনুমোদনের মাধ্যমে লিকুইডেটর নিয়োগ করা
হয়। |
|
লক্ষ্য |
কোম্পানির সম্পদ শেয়ারহোল্ডারের মধ্যে ন্যায্যভাবে বিতরণ করা। |
ক্রেডিটরদের পাওনা সর্বাধিক পরিমাণে আদায় করা। |
|
ক্রেডিটরের ভূমিকা |
শুধুমাত্র অবহিত করা
হয়। |
কার্যকর ভূমিকা রাখে;
লিকুইডেশনের সিদ্ধান্ত ও
দায়
বিতরণে প্রভাব ফেলে। |
অফিসিয়াল
লিকুইডেটরের কর্তব্য কী?
অফিসিয়াল
লিকুইডেটরের
প্রধান
কর্তব্য
1. কোম্পানির সম্পদ সনাক্ত ও সংগ্রহ করা: কোম্পানির সকল সম্পদ যেমন জমি, ভবন, যন্ত্রপাতি, ব্যাংক ব্যালান্স ইত্যাদি সনাক্ত করা। সম্পদের বাজারমূল্য নির্ধারণ করা।
2. দায় নির্ণয় ও ক্রেডিটরদের তালিকা প্রস্তুত করা: কোম্পানির সমস্ত দেনা ও পাওনা চিহ্নিত
করা। ক্রেডিটর এবং অন্যান্য পাওনাদারদের তালিকা তৈরি করা।
3. সম্পদ বিক্রি করা ও নগদে রূপান্তর করা: কোম্পানির সম্পদ বিক্রি করে নগদ অর্থে রূপান্তর করা। ন্যায্যতা বজায় রেখে বিক্রয় নিশ্চিত করা।
4. দায় পরিশোধ করা: সমস্ত ক্রেডিটরদের পাওনা যথাযথ ক্রমে পরিশোধ করা। সাধারণত, প্রথমে secured creditors, তারপর unsecured creditors।
5. অবশিষ্ট অর্থ শেয়ারহোল্ডারের মধ্যে বিতরণ করা: দায় মেটানোর পর বাকি অর্থ
শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে ন্যায়সঙ্গতভাবে বিতরণ করা।
6. লিকুইডেশন রিপোর্ট আদালতে জমা দেওয়া: সম্পূর্ণ লিকুইডেশন প্রক্রিয়া, সম্পদ বিক্রয় ও অর্থ বিতরণের
বিস্তারিত রিপোর্ট আদালতে দাখিল করা।
7. কোম্পানির নাম রেজিস্ট্রি থেকে মুছে দেওয়া: লিকুইডেশন শেষে কোম্পানির নাম রেজিস্ট্রি থেকে বাদ দেওয়া।এর ফলে কোম্পানি আইনত বন্ধ হয়ে যায়।
অফিসিয়াল লিকুইডেটর হলেন কোম্পানির নিষ্পত্তিকারক। তার মূল
দায়িত্ব হলো: কোম্পানির সম্পদ সুরক্ষিত রাখা,দায় পরিশোধ করা,এবং অবশিষ্ট সম্পদ শেয়ারহোল্ডারের মধ্যে ন্যায্যভাবে বিতরণ করা
No comments