কোম্পানির পরিমেল নিয়মাবলী কী? কীভাবে এগুলির পরিবর্তন করা যায়? কোম্পানি ও এর সদস্যরা পরিমেল নিয়মাবলী মানতে কতটুকু বাধ্য? ‘আল্ট্রা ভাইরাস মতবাদ’ এবং ‘টারকোয়েড’ এর মামলায় বিধৃত বিধির মধ্যে পার্থক্যের তুলনামূলক আলোচনা কর।
১১. কোম্পানির পরিমেল নিয়মাবলী কী? কীভাবে এগুলির পরিবর্তন করা যায়? কোম্পানি ও এর সদস্যরা
পরিমেল নিয়মাবলী মানতে কতটুকু বাধ্য? ‘আল্ট্রা ভাইরাস মতবাদ’ এবং ‘টারকোয়েড’ এর মামলায় বিধৃত
বিধির মধ্যে পার্থক্যের তুলনামূলক আলোচনা কর।
কোম্পানির পরিমেল নিয়মাবলী (Articles of
Association – AoA)
সংজ্ঞা:
কোম্পানির পরিমেল নিয়মাবলী হলো সেই লিখিত নিয়ম ও বিধি, যা কোম্পানির অভ্যন্তরীণ প্রশাসন, পরিচালনা এবং সদস্যদের অধিকার ও কর্তব্য নির্ধারণ করে।
মূল দিকসমূহ:
1. এটি কোম্পানির অভ্যন্তরীণ সংবিধান হিসেবে কাজ করে।
2. বোর্ড ও শেয়ারহোল্ডাররা কীভাবে কোম্পানি
পরিচালনা করবে, কোন প্রক্রিয়ায় মিটিং হবে, শেয়ার হস্তান্তর বা লভ্যাংশ বিতরণ
কিভাবে হবে ইত্যাদি এখানে উল্লেখ থাকে।
3. পরিমেল নিয়মাবলী কোম্পানির মেমোর্যান্ডাম অব অ্যাসোসিয়েশন (Memorandum
of Association) এবং
কোম্পানি
আইন
অনুযায়ী
হতে হবে।
কীভাবে
এগুলির পরিবর্তন করা যায়
১. AoA পরিবর্তনের সংজ্ঞা
AoA হলো কোম্পানির অভ্যন্তরীণ সংবিধান। কখনো কখনো কোম্পানির কার্যক্রমে নতুন প্রয়োজন বা শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ অনুযায়ী এটিতে পরিবর্তন প্রয়োজন হয়।
এই পরিবর্তনকে বলা হয় “Alteration of
Articles of Association”।
২. পরিবর্তনের প্রক্রিয়া
ধাপ ১: বোর্ডের প্রস্তাব
বোর্ড সভায় AoA পরিবর্তনের প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। প্রস্তাবে উল্লেখ থাকে কোন ধারা পরিবর্তন হচ্ছে, নতুন নিয়ম কী হবে।
ধাপ ২: সাধারণ সভায় নোটিশ
শেয়ারহোল্ডারদের কমপক্ষে ২১ দিনের নোটিশ দিতে হবে। নোটিশে পরিবর্তনের কারণ, প্রস্তাবিত ধারা এবং ভোটের ধরণ উল্লেখ করতে হবে।
ধাপ ৩: সাধারণ সভায় বিশেষ রেজোলিউশন পাস
AoA পরিবর্তনের জন্য সাধারণত বিশেষ রেজোলিউশন (Special
Resolution) প্রয়োজন।
বিশেষ রেজোলিউশনের জন্য সর্বনিম্ন ৭৫% ভোটের সমর্থন প্রয়োজন।
ধাপ ৪: রেজিস্ট্রার বা কোম্পানি রেজিস্ট্রার অফিসে নথিভুক্তকরণ
রেজোলিউশন পাস হওয়ার পর সংশোধিত AoA রেজিস্ট্রার অফ কোম্পানিতে জমা দিতে হবে। জমা দেওয়ার
পরই পরিবর্তন আইনগতভাবে কার্যকর হয়।
৩. পরিবর্তনের সীমাবদ্ধতা
1. আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্য: AoA পরিবর্তন কোম্পানি আইনের ধারা লঙ্ঘন করতে পারবে না।
2. শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ না করা: সংখ্যালঘিষ্ঠ শেয়ারহোল্ডারের অধিকার ক্ষুণ্ণ করে কোনো পরিবর্তন করলে আদালত বাতিল করতে পারে।
3. মেমোর্যান্ডাম অব অ্যাসোসিয়েশন (MoA) অনুযায়ী: AoA-এর পরিবর্তন MoA-র
সাথে সাংঘর্ষিক হলে, প্রাধান্য MoA-র।
কোম্পানি
ও এর সদস্যরা পরিমেল
নিয়মাবলী মানতে কতটুকু বাধ্য?
১. কোম্পানির বাধ্যবাধকতা
1. কোম্পানি AoA অনুসরণ করতে বাধ্য:
o
AoA হলো
কোম্পানির অভ্যন্তরীণ সংবিধান।
o
কোম্পানির
বোর্ড এবং কর্মকর্তারা AoA-এর ধারা অনুযায়ী কোম্পানির কার্যক্রম পরিচালনা করতে বাধ্য।
2. আইনের সীমার মধ্যে বাধ্যবাধকতা:
o
AoA কোম্পানি
আইন বা MoA-এর ধারা লঙ্ঘন
করতে পারবে না।
o
যদি
কোম্পানি AoA লঙ্ঘন করে, তাহলে সেই কার্যক্রম অবৈধ বা চ্যালেঞ্জযোগ্য হতে পারে।
২. সদস্যদের বাধ্যবাধকতা
1. AoA
একটি
চুক্তির
মতো:
o
সদস্যরা
স্বতঃসিদ্ধভাবে AoA-এর নিয়ম অনুসরণ
করতে বাধ্য।
o
AoA-এ
উল্লিখিত শেয়ারের হস্তান্তর, ভোটের প্রক্রিয়া, লভ্যাংশ গ্রহণ ইত্যাদি সদস্যদের জন্য আইনগত বাধ্যবাধকতা।
2. লঙ্ঘনের ফলাফল:
o
AoA লঙ্ঘন
করলে সদস্যদের বিরুদ্ধে কোম্পানির বা অন্য সদস্যদের মামলা হতে পারে।
o
উদাহরণ:
শেয়ার হস্তান্তর করতে AoA-এর অনুমোদন না
নেওয়া → লেনদেন অবৈধ।
৩. চুক্তি এবং আদালতের দৃষ্টি
·
AoA হলো
কোম্পানি এবং তার সদস্যদের মধ্যে চুক্তির সমতুল্য।
·
আদালত
সাধারণত AoA অনুসরণের জন্য ‘অলটারেশন, লিফটিং ভেইল বা অন্যান্য ব্যবস্থা’ গ্রহণ করতে পারে যদি কেউ এটি উপেক্ষা করে।
·
সংখ্যালঘিষ্ঠ
শেয়ারহোল্ডাররা যদি AoA লঙ্ঘনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হন, তারা অপপ্রয়োগের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারে।
৪. উদাহরণ
1. বোর্ডের অনুমোদন ব্যতীত লভ্যাংশ বিতরণ → AoA লঙ্ঘন, আদালত বাতিল করতে পারে।
2. শেয়ার হস্তান্তর অনুমোদন ছাড়া করা → AoA অনুযায়ী অবৈধ।
3. সাধারণ সভা ডাকতে AoA-এর ধারা অমান্য করা → সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জযোগ্য।
‘আল্ট্রা
ভাইরাস মতবাদ’ এবং ‘টারকোয়েড’ এর মামলায় বিধৃত
বিধির মধ্যে পার্থক্যের তুলনামূলক আলোচনা কর।
১. Ultra Vires
Doctrine (আল্ট্রা ভাইরাস মতবাদ)
সংজ্ঞা:
কোম্পানির যে কার্যক্রম তার
Memorandum of Association (MoA) বা AoA অনুযায়ী অনুমোদিত নয়, সেটিকে Ultra Vires
বলা হয়। এই ধরনের কার্যক্রম
আইনগতভাবে অবৈধ।
মূল দিকসমূহ:
1. কোম্পানি তার অনুমোদিত উদ্দেশ্যের বাইরে কোনো কাজ করতে পারবে না।
2. Ultra
Vires লেনদেন শূন্য বা বাতিলযোগ্য।
3. তৃতীয় পক্ষ জানলেও লেনদেন বৈধ নয়।
উদাহরণমূলক
মামলা:
·
Ashbury Railway Carriage Co. v. Riche (1875)
o
কোম্পানি
অনুমোদিত ব্যবসার বাইরে কাজ করলে লেনদেন অবৈধ ঘোষণা করা হয়।
লক্ষ্য:
·
কোম্পানির
ক্ষমতা সীমাবদ্ধ রাখা।
·
শেয়ারহোল্ডারদের
স্বার্থ ও কোম্পানির উদ্দেশ্য
রক্ষা করা।
২. Turquand Rule
/ Indoor Management Rule (টারকোয়েড
নিয়ম)
সংজ্ঞা:
তৃতীয় পক্ষ (outsider) যদি কোম্পানির অভ্যন্তরীণ অনুমোদন বা প্রক্রিয়া জানে না, তবে তারা বৈধভাবে ধরে নিতে পারে যে কোম্পানি অভ্যন্তরীণ
নিয়ম অনুযায়ী কাজ করেছে।
মূল দিকসমূহ:
1. এটি তৃতীয় পক্ষকে সুরক্ষা দেয়, যা কোম্পানির অভ্যন্তরীণ
আনুষ্ঠানিকতা জানে না।
2. তৃতীয় পক্ষের দৃষ্টিকোণ থেকে লেনদেন বৈধ গণ্য হবে যদি তারা ভালো বিশ্বাসে (bona fide)
কাজ করেছে।
3. কোম্পানির অভ্যন্তরীণ নিয়ম ভাঙা হলেও তৃতীয় পক্ষের জন্য লেনদেন বৈধ থাকে।
উদাহরণমূলক
মামলা:
·
Royal British Bank v. Turquand (1856)
o
ব্যাংক
বা তৃতীয় পক্ষ বোঝে না যে বোর্ড
অনুমোদন দেয়নি, তবুও লেনদেন বৈধ।
লক্ষ্য:
·
কোম্পানির
অভ্যন্তরীণ জটিলতা তৃতীয় পক্ষের জন্য সমস্যা না হয়।
·
বাহ্যিক
পক্ষের বিশ্বাসযোগ্য লেনদেন সুরক্ষিত হয়।
৩. তুলনামূলক টেবিল
|
দিক |
Ultra Vires
Doctrine |
Turquand Rule |
|
মূল ধারণা |
কোম্পানির
ক্ষমতা সীমাবদ্ধ; অনুমোদিত উদ্দেশ্যের বাইরে কাজ অবৈধ |
তৃতীয়
পক্ষকে কোম্পানির অভ্যন্তরীণ নিয়ম জানার দরকার নেই; বৈধ লেনদেন ধরে নেওয়া যায় |
|
উদ্দেশ্য |
কোম্পানি
ও শেয়ারহোল্ডারের স্বার্থ রক্ষা, ক্ষমতা সীমাবদ্ধ রাখা |
তৃতীয়
পক্ষের সুরক্ষা এবং লেনদেনের সহজতা |
|
কেন্দ্রীয় মামলা |
Ashbury Railway Carriage
Co. v. Riche |
Royal British Bank v.
Turquand |
|
লেনদেন বৈধতা |
অনুমোদিত
সীমার বাইরে লেনদেন অবৈধ |
অভ্যন্তরীণ
অনুমোদন জানা না থাকলেও তৃতীয় পক্ষের জন্য বৈধ |
|
কোথায় প্রয়োগ |
কোম্পানির
ক্ষমতা ও উদ্দেশ্য সীমাবদ্ধ করা |
বাহ্যিক
পক্ষের বিশ্বাসযোগ্য লেনদেনের জন্য |
No comments