ক) ভূমি জরিপ কী? ভূমি জরিপের গুরুত্ব কী? বিভিন্ন প্রকার জরিপের ত্রুটি বিচ্যুতি আলোচনাসহ ভূমি জরিপের প্রকারভেদ বর্ণনা করুন।
৯
। (ক)
ভূমি জরিপ কী? ভূমি জরিপের গুরুত্ব কী? বিভিন্ন প্রকার জরিপের ত্রুটি বিচ্যুতি আলোচনাসহ ভূমি জরিপের প্রকারভেদ বর্ণনা করুন।
ভূমি জরিপ কী?
ভূমি জরিপ হলো—কোনো নির্দিষ্ট এলাকার জমির পরিমাপ, সীমানা নির্ধারণ, মালিকানা ও দখল সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ এবং নকশা ও রেকর্ড প্রস্তুতের প্রক্রিয়া।
সহজভাবে বললে, জমির সঠিক পরিমাণ, অবস্থান, মালিক কে, কীভাবে ব্যবহার হচ্ছে—এসব তথ্য সরকারি ভাবে নির্ধারণ ও লিপিবদ্ধ করাকেই
ভূমি জরিপ বলা হয়।
ভূমি জরিপের উদ্দেশ্য
·
জমির
সঠিক সীমানা নির্ধারণ
·
মালিকানা
ও দখল রেকর্ড তৈরি
·
ভূমি
রাজস্ব নির্ধারণ
·
ভূমি
সংক্রান্ত বিরোধ কমানো
বাংলাদেশে ভূমি জরিপ ও রেকর্ড প্রস্তুতের
কার্যক্রম সাধারণত ভূমি প্রশাসনের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।
ভূমি
জরিপের
গুরুত্ব কী?
ভূমি জরিপের গুরুত্ব:
ভূমি
জরিপের
মাধ্যমে জমি,
সীমানা
এবং
মালিকানা সম্পর্কিত সঠিক
তথ্য
পাওয়া
যায়।
এর
গুরুত্ব প্রধানত নিচের
দিকগুলোতে প্রতিফলিত হয়—
- মালিকানা
নিশ্চিত করা:
জমির আসল মালিক এবং দখলকারী নির্ধারণে ভূমি জরিপ অপরিহার্য। - সীমানা
নির্ধারণ:
জমির সঠিক সীমানা চিহ্নিত করার মাধ্যমে পার্শ্ববর্তী জমির সাথে বিরোধ কমানো যায়। - ভূমি
বিরোধ নিরসন:
মালিকানা ও সীমানা সংক্রান্ত আইনগত বিরোধ বা দখল বিবাদ সহজে সমাধান করা যায়। - রাজস্ব
ও কর নির্ধারণ:
সরকারি রাজস্ব ও কর ঠিকভাবে সংগ্রহ করার জন্য জমির পরিমাণ ও ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়। - উন্নয়ন
পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা:
শহরায়ন, সড়ক, জলাশয়, কৃষি ও শিল্প উন্নয়নের পরিকল্পনা ঠিকভাবে করতে ভূমি জরিপ সহায়ক। - আইনি
প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত:
জমি বিক্রি, ক্রয়, বন্ধক ও চুক্তিতে ভূমি জরিপের রেকর্ড প্রমাণ হিসেবে কাজ করে।
সারসংক্ষেপ: ভূমি জরিপ
হল
জমির
স্বচ্ছতা, সঠিক
ব্যবহার, আইনগত
নিরাপত্তা ও
উন্নয়ন পরিকল্পনার ভিত্তি।
বিভিন্ন
প্রকার জরিপের ত্রুটি বিচ্যুতি আলোচনাসহ ভূমি জরিপের প্রকারভেদ বর্ণনা করুন।
ভূমি জরিপের প্রকারভেদ ও ত্রুটি/বিচ্যুতি
ভূমি জরিপের কাজ মূলত জমির পরিমাপ, সীমানা নির্ধারণ ও নকশা প্রস্তুতির
জন্য করা হয়। এটি বিভিন্ন ধরনের হতে পারে এবং প্রতিটি ধরনের সাথে কিছু সম্ভাব্য ত্রুটি বা বিচ্যুতি যুক্ত
থাকে।
নিচে
বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
১) ভূমি জরিপের প্রধান প্রকারভেদ
১. প্রাথমিক (Primary) জরিপ
জমির মোট এলাকার পরিমাপ ও সীমানা চিহ্নিত
করার জন্য করা হয়।সাধারণত সরকারি কর্মকর্তারা বৃহৎ মানচিত্র বা ক্ষেত্র পর্যায়ে
করেন।
উদ্দেশ্য:
সার্বিক সীমানা ও মালিকানা চিহ্নিত
করা।
২. বিস্তারিত
(Detailed/Secondary) জরিপ
প্রাথমিক জরিপের পরে, জমির ছোট অংশ বা প্লট পর্যায়ে
বিস্তারিত পরিমাপ করা হয়।এতে জমির আকার, অংশ, প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতা (নালা, গাছ, পুকুর) অন্তর্ভুক্ত হয়।
উদ্দেশ্য:
ব্যক্তিগত চুক্তি, বিক্রয়, উন্নয়ন বা কর নির্ধারণের
জন্য ব্যবহার।
৩. ফলাফলমূলক (Cadastral) জরিপ
এটি জমির আইনি দখল ও মালিকানা রেকর্ড তৈরি করতে হয়।মূলত রেকর্ড প্রস্তুতির জন্য জরিপ করা হয়।উদ্দেশ্য: প্রমাণমূলক নথি তৈরি এবং ভবিষ্যতে বিরোধ এড়ানো।
৪. তথ্যসংগ্রাহী
(Reconnaissance/Preliminary) জরিপ
বড় এলাকার প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহের জন্য করা হয়।এটি সাধারণত পরিকল্পনা ও নকশা তৈরির
জন্য ব্যবহৃত হয়।
২) ভূমি জরিপে সাধারণ ত্রুটি বা বিচ্যুতি
ভূমি জরিপে যে ত্রুটি বা
বিচ্যুতি দেখা দিতে পারে, তা মূলত পরিমাপ,
চিহ্নিতকরণ বা নথি সংক্রান্ত
হয়। প্রধান ত্রুটিগুলো হলো—
1. মানব ত্রুটি (Human Error)
পরিমাপের সময় ভুল, ভুল সীমানা চিহ্নিত করা।
2. উপকরণের ত্রুটি (Instrumental
Error)
পরিমাপের যন্ত্র বা টুলসের ত্রুটি।
উদাহরণ: দোষযুক্ত মাপজোক যন্ত্র।
3. প্রাকৃতিক/পরিবেশগত ত্রুটি
(Natural/Environmental Error)
নদী, পাহাড়, গাছ বা পরিবর্তনশীল ভূমি
আকৃতির কারণে পরিমাপে বিভ্রান্তি।
4. মানচিত্র বা নথি ত্রুটি (Map/Record Error)
পুরনো মানচিত্র, ভুল নথি বা অসঙ্গতিপূর্ণ রেকর্ড।
5. আইনি বা চুক্তিগত অসঙ্গতি
জমির মালিকানা বা দখল সম্পর্কিত
তথ্য ঠিকমতো নথিভুক্ত না থাকা।
সংক্ষেপে
ভূমি জরিপের প্রকার: প্রাথমিক, বিস্তারিত, ফলাফলমূলক (Cadastral), তথ্যসংগ্রাহীপ্রতিটি জরিপে ত্রুটি বা বিচ্যুতি হতে পারে: মানবিক, যন্ত্রগত, প্রাকৃতিক, নথি বা আইনি অসঙ্গতি
থেকে।এই ত্রুটিগুলো কমানোর জন্য আধুনিক যন্ত্র, সঠিক নকশা এবং আইনি যাচাই প্রয়োজন।
৯. নামজারি
কী? নামজারির দরখাস্তের কারণগুলো কী? নামজারির দরখাস্তকালে, নামজারির মামলা চলাকালে এবং নামজারির মামলায় সিদ্ধান্ত হলে যেসব আনুষ্ঠানিকতা পালন করতে হয় তা বর্ণনা করুন।
২০০৬ সালে রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব (সংশোধন)
আইন নামজারির ক্ষেত্রে কি কি সংস্কার
এসেছে? আপনি কি মনে করেন
এসব সংস্কার সঠিকভাবে করা হয়েছে?
নামজারি
কী?
নামজারি হলো—কোনো জমির মালিকানা বা দখল সরকারি রেকর্ডে আইনগতভাবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়া।
সহজভাবে বলতে গেলে, এটি সেই প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে জমির “কার দখলে” তা সরকারি দফতরে
চূড়ান্তভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়, যাতে ভবিষ্যতে মালিকানা বা দখল নিয়ে
বিরোধ না হয়।
নামজারির দরখাস্তের কারণগুলো:
নামজারি করতে
জমিদার
বা
প্রজা
সাধারণত নিম্নলিখিত কারণে
আবেদন
করেন—
- দখল
প্রমাণীকরণ:জমির মালিক বা প্রজা তার দখল বা মালিকানা সরকারী রেকর্ডে অন্তর্ভুক্ত করতে চায়।
- বিরোধ
সমাধান:জমি দখল নিয়ে পার্শ্ববর্তী জমির মালিকের সাথে বিরোধ থাকলে।
- উন্নয়ন
বা চুক্তির সুবিধা:জমি বিক্রয়, বন্ধক, নির্মাণ বা উন্নয়নের জন্য নামজারি প্রয়োজন।
- নথি
বা রেকর্ডের অসঙ্গতি দূরীকরণ:পুরনো বা ভুল নথি সংশোধন ও
সঠিক তথ্য অন্তর্ভুক্ত করার জন্য।
- আইনি
স্বীকৃতি:ভবিষ্যতে আইনগত প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করার জন্য জমির দখল বা মালিকানা নিশ্চিত করা।
নামজারি প্রক্রিয়ায় আনুষ্ঠানিকতা
নামজারি প্রক্রিয়ায় সাধারণত তিনটি ধাপ থাকে—দরখাস্ত, মামলা চলাকালীন, এবং সিদ্ধান্ত/রায়ের পর। প্রতিটি ধাপে
যেসব আনুষ্ঠানিকতা পালন করতে হয় তা নিচে বর্ণনা
করা হলো—
১) নামজারির দরখাস্তকালে
·
জমিদার
বা প্রজা সংশ্লিষ্ট জমি অফিসে লিখিত আবেদন (দরখাস্ত) জমা দেন।
·
দরখাস্তে
অন্তর্ভুক্ত করতে হয়:
o
জমির
পরিমাণ ও সীমানা,
o
মালিকানা
ও দখলের প্রমাণপত্র (দলিল, রশিদ, আগের নামজারি সনদ)
o
জমি
সংক্রান্ত কোনো বিরোধ থাকলে তার বিবরণ
·
জমির
দখল ও মালিকানা যাচাইয়ের
জন্য প্রাথমিক নথি যাচাই করা হয়।
২) নামজারির মামলা চলাকালীন
জমিদার ও প্রজার উভয়ের
যুক্তি, দলিল ও সাক্ষ্য সংগ্রহ করা হয়।ভূমি কর্মকর্তারা বা আদালত প্রয়োজনে
স্থল পরিদর্শন (site inspection)
করেন।উভয় পক্ষকে নোটিশ পাঠানো, শুনানি নেওয়া এবং বৈধ দলিল যাচাই করা।জমির সীমানা, দখল এবং ব্যবহার সম্পর্কিত প্রমাণ যাচাই করা।
৩) নামজারির মামলায় সিদ্ধান্ত হলে
আদালত বা ভূমি কর্মকর্তা
নামজারি রেকর্ডে অন্তর্ভুক্তির আদেশ জারি করেন। নামজারি সনদ বা দলিল প্রজাকে বা জমিদারকে প্রদান
করা হয়।কোন পক্ষ আপত্তি করলে আপিল বা পুনর্বিবেচনার সুযোগ থাকে। রেকর্ড ও দলিল সংরক্ষণ
করে ভবিষ্যতে আইনি প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
২০০৬ সালের রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব (সংশোধন) আইন—নামজারির ক্ষেত্রে সংস্কার
২০০৬ সালের এই সংশোধনীতে মূলত
নামজারি প্রক্রিয়াকে দ্রুত, স্বচ্ছ এবং প্রজার স্বত্ব রক্ষায় সহায়ক করার জন্য কিছু সংস্কার করা হয়। প্রধান সংস্কারগুলো হলো—
১) নামজারি প্রক্রিয়া দ্রুত করা
দরখাস্ত থেকে নামজারি রেকর্ডে অন্তর্ভুক্তি পর্যন্ত নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।প্রজাদের জন্য ঝামেলা কমানো এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা হয়েছে।
২) বিরোধ নিষ্পত্তির সহজীকরণ
জমিদার ও প্রজার মধ্যে
বিরোধ স্থানীয় ভূমি কর্মকর্তার মাধ্যমে বা বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে দ্রুত সমাধান করার বিধান রাখা হয়েছে।স্থানীয় শুনানি ও স্থলপরিদর্শনকে বাধ্যতামূলক
করা হয়েছে।
৩) নথি ও সনদপত্রের স্বচ্ছতা
বৃদ্ধি
নামজারি রেকর্ডে দলিল, নকশা ও প্রমাণপত্র সংরক্ষণের মানসম্মত ব্যবস্থা করা হয়েছে।ডিজিটাল বা কেন্দ্রীভূত রেকর্ডের
মাধ্যমে তথ্য সহজে যাচাইযোগ্য হয়েছে।
৪) আইনি সুরক্ষা বৃদ্ধি
প্রজার দখল ও স্বত্ব রক্ষায় আইনগত বিধান নিশ্চিত করা হয়েছে।অবৈধ উচ্ছেদ বা দখল লঙ্ঘন
প্রতিরোধে শক্তিশালী ধারা যুক্ত করা হয়েছে।
৫) সংস্কারের মূল্যায়ন
সকারাত্মক
দিক:
·
বিরোধ
নিষ্পত্তি দ্রুত হয়েছে।
·
প্রজাদের
স্বত্ব সুরক্ষিত হয়েছে।
·
নথিপত্র
ও দলিলের স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
সীমাবদ্ধতা
/ চ্যালেঞ্জ:
·
গ্রামীণ
অঞ্চলে এখনও অনেক নামজারি রেকর্ড অসম্পূর্ণ বা ভুল আছে।
·
স্থানীয়
প্রশাসনের মানবসম্পদ ও দক্ষতার অভাব কারণে প্রক্রিয়া ধীর।
·
পুরনো
নথি বা দলিল না
থাকায় সব প্রজার নামজারি
কার্য সম্পন্ন হয়নি।
আইনের কাঠামো সঠিক এবং প্রজার স্বত্ব রক্ষায় কার্যকর, তবে বাস্তবায়ন এখনও কিছু এলাকায় অপর্যাপ্ত। প্রশাসনিক দক্ষতা ও ডিজিটাল রেকর্ড
ব্যবস্থার উন্নতি প্রয়োজন।
No comments