ছাঁটাই কী? ছাঁটাই-এর শর্ত, ছাঁটাই-এর পদ্ধতি এবং ছাঁটাই-এর ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ সম্পর্কিত বিধানাবলি আলোচনা কর । ছাঁটাইকৃত শ্রমিকের পুনর্নিয়োগ কি সম্ভব? কোনো স্থায়ী শ্রমিক কি তার নিজের চাকরির অবসান ঘটাতে পারে? আলোচনা কর ।কখন একজন শ্রমিক তার চাররির অবসানের আদেশের বিরুদ্ধে নালিশ করতে পারে।জয়পুরহাট চিনি মিলে কর্মরত শ্রমিক হামিদ ১৪ দিনের অধিক সময় বিনা ছুটিতে অনুপস্থিত ছিল। এর জন্য তাকে শাস্তি দেয়া যাবে কি?
১৭.
(ক) ছাঁটাই কী? (খ) ছাঁটাই-এর
শর্ত, ছাঁটাই-এর পদ্ধতি এবং
ছাঁটাই-এর ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ
সম্পর্কিত বিধানাবলি আলোচনা কর । (গ)
ছাঁটাইকৃত শ্রমিকের পুনর্নিয়োগ কি সম্ভব?
(ক) ছাঁটাই কী?
ছাঁটাই
(Retrenchment) বলতে
বোঝায়—
কোনো শিল্প বা প্রতিষ্ঠান অপ্রয়োজনীয়
শ্রমিককে সাময়িক বা স্থায়ীভাবে কাজের প্রয়োজনীয়তা কমে যাওয়ার কারণে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া।
এটি অবৈধ বরখাস্ত নয়, তবে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণে আইনসম্মত হতে হয়।
(খ) ছাঁটাই-এর শর্ত, পদ্ধতি
এবং ক্ষতিপূরণ
১. ছাঁটাই-এর শর্ত
বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ অনুযায়ী ছাঁটাই শুধুমাত্র নিম্নলিখিত শর্তে বৈধ—
1. শিল্প বা প্রতিষ্ঠানে কাজের প্রকৃত প্রয়োজন কমে যাওয়া।
2. শ্রমিককে ছাঁটাইয়ের আগে পর্যাপ্ত নোটিশ প্রদান করা।
3. ছাঁটাই বাছাই নীতির ভিত্তিতে করা (সাধারণত “Last In, First
Out” বা LOFO নীতি)।
4. কোনো ছাঁটাই লিঙ্গ, বয়স বা ট্রেড ইউনিয়নের সদস্যপদ ভিত্তিতে বৈষম্যবিহীন।
২. ছাঁটাই-এর পদ্ধতি
ছাঁটাই কার্যক্রমের জন্য আইন অনুযায়ী পদ্ধতি—
1. নোটিশ প্রদান:
o
সাধারণত
শ্রমিককে ৩০ দিনের লিখিত নোটিশ দিতে হবে।
o
অথবা
৩০ দিনের মজুরি সমপরিমাণ ভাতা প্রদান করতে হবে।
2. ছাঁটাইয়ের আদেশ লিখিতভাবে জানানো।
3. বাছাই নীতি অনুযায়ী নির্বাচন:
o
অপ্রয়োজনীয়
শ্রমিকদের প্রাধান্যক্রমে ছাঁটাই।
4. লগ সংরক্ষণ:
o
ছাঁটাই
সম্পর্কিত রেকর্ড সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক।
৩. ছাঁটাই-এর ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ
আইনের ধারা অনুযায়ী ছাঁটাইকৃত শ্রমিকরা ক্ষতিপূরণের অধিকারী—
1. নোটিশ না দিলে বা নোটিশের বদলে মজুরি না দিলে: ৩০ দিনের মজুরি
সমপরিমাণ টাকা।
2. অতিরিক্ত ক্ষতিপূরণ:
o
চাকরির
মেয়াদ অনুযায়ী ভাতা।
o
শ্রমিকদের
বকেয়া ছুটি বা অন্যান্য সুবিধা
দিতে হবে।
3. বিচার বা শ্রম আদালতের মাধ্যমে অতিরিক্ত ক্ষতিপূরণ দাবি করা যায়।
(গ) ছাঁটাইকৃত শ্রমিকের পুনর্নিয়োগ সম্ভব কি না?
·
শ্রম
আইন অনুযায়ী ছাঁটাই স্থায়ী নয়, তবে পুনর্নিয়োগের সুযোগ থাকে শর্তসাপেক্ষে—
1. যদি ভবিষ্যতে কাজের প্রয়োজন পুনরায় বৃদ্ধি পায়।
2. পুনর্নিয়োগের ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা বিবেচনা
করা হয়।
3. পুনর্নিয়োগ শ্রমিকের জন্য স্বেচ্ছামূলক এবং নিয়োগকর্তার ন্যায্য সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করে।
অর্থাৎ, আইন কোনোরূপ বাধ্যবাধকতা দেয় না, তবে পুনর্নিয়োগে বৈষম্য করা যাবে না।
উপসংহার
ছাঁটাই হলো শ্রমিকের চাকরিতে সাময়িক বা স্থায়ী অবসান,
যা আইনসঙ্গত নোটিশ, বাছাই নীতি এবং ক্ষতিপূরণের বিধান পূরণ করলে বৈধ। পুনর্নিয়োগ সম্ভাব্য
হলেও তা নিয়োগকর্তার ন্যায্য
বিবেচনার উপর নির্ভর করে।
১৮.
(ক) কোনো স্থায়ী শ্রমিক কি তার নিজের
চাকরির অবসান ঘটাতে পারে? আলোচনা কর । (খ)
কখন একজন শ্রমিক তার চাররির অবসানের আদেশের বিরুদ্ধে নালিশ করতে পারে? (গ) জয়পুরহাট চিনি
মিলে কর্মরত শ্রমিক হামিদ ১৪ দিনের অধিক
সময় বিনা ছুটিতে অনুপস্থিত ছিল। এর জন্য তাকে
শাস্তি দেয়া যাবে কি?
নিচে প্রশ্ন নং–১৮ এর
তিনটি অংশ বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ অনুযায়ী পরিষ্কার, যুক্তিসংগত ও পরীক্ষায় উপযোগীভাবে
আলোচনা করা হলো—
(ক) কোনো স্থায়ী শ্রমিক কি তার নিজের
চাকরির অবসান ঘটাতে পারে?
হ্যাঁ, স্থায়ী শ্রমিক তার নিজের চাকরির অবসান ঘটাতে পারে। বাংলাদেশ শ্রম
আইন, ২০০৬ অনুযায়ী এটিকে সাধারণত ইস্তফা (Resignation)
বলা হয়।
শর্তাবলি—
1. স্থায়ী শ্রমিককে সাধারণত ৩০ দিনের লিখিত নোটিশ দিয়ে চাকরি ত্যাগ করতে হবে।
2. যদি নোটিশ না দেয়, তবে
৩০ দিনের মজুরির সমপরিমাণ অর্থ প্রদান করতে হবে।
3. চাকরি ত্যাগ স্বেচ্ছায় হতে হবে, জোর বা প্রতারণার মাধ্যমে
নয়।
ফলাফল—
·
আইনসম্মতভাবে
ইস্তফা দিলে শ্রমিক তার বকেয়া মজুরি ও অন্যান্য প্রাপ্য সুবিধা পাওয়ার অধিকারী হয়।
(খ) কখন একজন শ্রমিক তার চাকরির অবসানের আদেশের বিরুদ্ধে নালিশ করতে পারে?
বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ অনুযায়ী একজন শ্রমিক নিম্নলিখিত ক্ষেত্রে চাকরির অবসানের আদেশের বিরুদ্ধে নালিশ (অভিযোগ) করতে পারে—
1. যদি অবসানটি আইনসম্মত কারণ ছাড়া করা হয়
2. যদি শোকজ নোটিশ বা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দেওয়া হয়
3. যদি তদন্ত ছাড়াই বা ভুয়া অভিযোগের
ভিত্তিতে অবসান করা হয়
4. যদি অবসানটি বৈষম্যমূলক বা অসৎ শ্রম তৎপরতার ফল হয়
5. যদি আইন অনুযায়ী প্রাপ্য নোটিশ বা ক্ষতিপূরণ না দেওয়া হয়
অভিযোগের পদ্ধতি (সংক্ষেপে)—
·
প্রথমে
নিয়োগকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ
·
সন্তোষজনক
সমাধান না হলে নির্ধারিত
সময়ের মধ্যে শ্রম আদালতে মামলা
(গ) জয়পুরহাট চিনি মিলে কর্মরত শ্রমিক হামিদ ১৪ দিনের অধিক
সময় বিনা ছুটিতে অনুপস্থিত ছিল। এর জন্য তাকে
শাস্তি দেওয়া যাবে কি?
আইনগত বিশ্লেষণ—
বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ অনুযায়ী—
·
১৪
দিনের
বেশি
বিনা
অনুমতিতে
অনুপস্থিত
থাকা
একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ (Misconduct)
হিসেবে গণ্য হতে পারে।
তবে শাস্তি দেওয়ার আগে যেসব শর্ত মানতে হবে—
1. শ্রমিক হামিদকে অবশ্যই শোকজ নোটিশ দিতে হবে
2. তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে
3. প্রয়োজনে তদন্ত বা শুনানি করতে হবে
4. অভিযোগ প্রমাণিত হলে আনুপাতিক শাস্তি দিতে হবে
উপসংহার—
·
হ্যাঁ,
হামিদকে শাস্তি দেওয়া আইনগতভাবে সম্ভব
·
কিন্তু
যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করলে শাস্তি অবৈধ হবে
·
সরাসরি
বরখাস্ত বা চাকরি অবসান
করা যাবে না, যদি না অভিযোগ প্রমাণিত
হয়
উপসংহার
বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ শ্রমিক ও নিয়োগকর্তা—উভয়ের
জন্যই ন্যায়সংগত ভারসাম্য বজায় রেখেছে।
·
স্থায়ী
শ্রমিক নিজে চাকরি ত্যাগ করতে পারে
·
অবৈধ
অবসানের বিরুদ্ধে নালিশের অধিকার রয়েছে
·
অননুমোদিত
অনুপস্থিতির জন্য শাস্তি দেওয়া গেলেও আইনসম্মত প্রক্রিয়া অনুসরণ বাধ্যতামূলক
No comments