রাজস্ব আইন এল এল বি ১ম বর্ষ পরীক্ষা স্পেশাল শর্ট সাজেশন অনুযায়ী প্রশ্ন উত্তর সহজ ও সাবলীয় ভাষায় পার্ট- ৬
রাজস্ব আইন এল এল বি ১ম বর্ষ পরীক্ষা স্পেশাল শর্ট সাজেশন অনুযায়ী প্রশ্ন উত্তর সহজ ও সাবলীয় ভাষায় পার্ট- ৬
১। রাজস্বনীতি কী? “একটি দেশ যত শিল্পোন্নত হয় আয়করের উপর তত বেশি গুরুত্ব দেয়া উচিত” তুমি কী এই কথার সাথে একমত? যুক্তিসহ আলোচনা কর। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে তোমার উত্তর প্রদান কর। বিস্তারিত
রাজস্বনীতি কী?
রাজস্বনীতি (Fiscal Policy) বলতে সরকারের সেই নীতিকে বোঝায়, যার মাধ্যমে কর ব্যবস্থা, সরকারি ব্যয় ও সরকারি ঋণ ব্যবহার করে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করা হয়। রাজস্বনীতির প্রধান উদ্দেশ্য হলো—
· অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধি অর্জন
· কর্মসংস্থান সৃষ্টি
· মূল্যস্থিতিশীলতা বজায় রাখা
· আয় ও সম্পদের বৈষম্য হ্রাস করা
· সামাজিক কল্যাণ নিশ্চিত করা
সরকার কর আরোপ ও ব্যয়ের পরিমাণ পরিবর্তনের মাধ্যমে অর্থনীতিতে চাহিদা ও সরবরাহ প্রভাবিত করে।
“একটি দেশ যত শিল্পোন্নত হয় আয়করের উপর তত বেশি গুরুত্ব দেয়া উচিত”—এই বক্তব্যের সাথে একমত কি?
আমি এই বক্তব্যের সাথে সম্পূর্ণ একমত। শিল্পোন্নতির সাথে আয়করের গুরুত্ব বাড়ানো অর্থনৈতিকভাবে যুক্তিসঙ্গত ও ন্যায়সংগত।
বক্তব্যের পক্ষে যুক্তিসমূহ
১. আয় নির্ধারণ সহজ হয়
শিল্পোন্নত দেশে অধিকাংশ মানুষ নিয়মিত চাকরি, কারখানা, কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান ও নথিভুক্ত ব্যবসার সাথে যুক্ত থাকে। ফলে ব্যক্তিগত ও কর্পোরেট আয় সহজে নির্ধারণ করা যায় এবং আয়কর আদায় কার্যকর হয়।
২. আয়কর একটি প্রগতিশীল কর
আয়কর প্রগতিশীল কর হওয়ায় উচ্চ আয়কারীরা বেশি হারে কর প্রদান করে এবং নিম্ন আয়কারীরা কম বা করমুক্ত থাকে। এর ফলে সামাজিক ন্যায়বিচার ও আয় বৈষম্য হ্রাস পায়।
৩. পরোক্ষ করের উপর নির্ভরতা কমে
শিল্পোন্নত দেশে আয়কর থেকে বেশি রাজস্ব পাওয়া যায় বলে VAT ও শুল্কের মতো পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরতা কমানো যায়। এতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম তুলনামূলক কম থাকে।
৪. রাজস্ব আহরণ স্থায়ী ও স্থিতিশীল হয়
শিল্প ও সেবাখাত থেকে নিয়মিত আয় সৃষ্টি হওয়ায় সরকারের রাজস্ব প্রবাহ ধারাবাহিক থাকে, যা উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহায়ক।
৫. অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহায়ক
আয়কর থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব সরকারকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে বেশি ব্যয় করার সুযোগ দেয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে আলোচনা
বাংলাদেশ বর্তমানে একটি উন্নয়নশীল ও ক্রমশ শিল্পায়নশীল দেশ। গার্মেন্টস শিল্প, ওষুধ শিল্প, চামড়া শিল্প, নির্মাণ, ব্যাংকিং ও আইটি খাতে দ্রুত অগ্রগতি হচ্ছে। তবুও বাংলাদেশের কর কাঠামোতে আয়করের অবদান এখনও তুলনামূলকভাবে কম।
বাংলাদেশের কর ব্যবস্থার বর্তমান বাস্তবতা
· কর-জিডিপি অনুপাত কম
· VAT ও শুল্কের মতো পরোক্ষ করের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা
· বৃহৎ অনানুষ্ঠানিক খাত
· কর ফাঁকি ও কর সচেতনতার অভাব
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আয়করের উপর গুরুত্ব বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা
1. শিল্পায়নের সাথে করভিত্তি সম্প্রসারণ: শিল্প ও সেবাখাত সম্প্রসারণের ফলে আয়করদাতার সংখ্যা বাড়ানো সম্ভব।
2. দরিদ্রবান্ধব করব্যবস্থা গঠন: পরোক্ষ কর কমিয়ে আয়কর বাড়ালে দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির ওপর করের বোঝা কমবে।
3. আয় বৈষম্য হ্রাস: উচ্চ আয়কারীদের ওপর বেশি কর আরোপ করে সামাজিক ভারসাম্য আনা যায়।
4. ডিজিটাল কর প্রশাসন: ই-টিআইএন, অনলাইন রিটার্ন ও অটোমেশন আয়কর আদায় সহজ করছে।
5. উন্নয়ন ব্যয়ের জোগান: শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ব্যয় বৃদ্ধির জন্য আয়কর গুরুত্বপূর্ণ উৎস হতে পারে।
সীমাবদ্ধতা
তবে বাস্তবতা বিবেচনায়—
· কর ফাঁকি
· কর প্রশাসনের দুর্বলতা
· অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি
এই সমস্যাগুলো সমাধান না করে শুধু আয়করের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, একটি দেশ যত শিল্পোন্নত হয়, আয়করের উপর তত বেশি গুরুত্ব দেয়া উচিত—এই বক্তব্যটি যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও শিল্পায়নের অগ্রগতির সাথে সাথে ধাপে ধাপে আয়করের গুরুত্ব বাড়ানো প্রয়োজন। তবে তা করতে হলে কর প্রশাসনের সংস্কার, কর ফাঁকি রোধ ও কর সচেতনতা বৃদ্ধি অপরিহার্য।
২। (ক) করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর বলতে কী বুঝ ?
(খ) আয়কর রিটার্ন কারা দিবেন? (গ) রিটার্ন দাখিলের পদ্ধতি বর্ণনা কর।
(ক) করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর বলতে কী বুঝ? (বিস্তারিত)
করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর বা TIN (Taxpayer Identification Number) হলো জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) কর্তৃক প্রদত্ত একটি স্বতন্ত্র, স্থায়ী ও একক নম্বর, যার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে আয়কর ব্যবস্থার আওতায় করদাতা হিসেবে শনাক্ত করা হয়।
সংজ্ঞা
করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর এমন একটি পরিচয়সংকেত, যা ব্যবহার করে কর কর্তৃপক্ষ একজন করদাতার কর সংক্রান্ত সকল তথ্য, লেনদেন ও রিটার্ন সহজে চিহ্নিত, সংরক্ষণ ও পর্যবেক্ষণ করতে পারে।
(খ) আয়কর রিটার্ন
কারা দিবেন? (বিস্তারিত ব্যাখ্যা)
আয়কর
আইন
অনুযায়ী নির্দিষ্ট ব্যক্তি, পেশাজীবী ও
প্রতিষ্ঠানকে নিয়মিত আয়কর রিটার্ন দাখিল করতে হয়। রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা শুধু
আয়ের
পরিমাণের ওপর
নয়,
অনেক
ক্ষেত্রে পেশা, পদ ও সম্পদের ধরন এর
ওপরও
নির্ভর
করে।
নিচে
বিস্তারিতভাবে আলোচনা
করা
হলো—
১। করযোগ্য আয় রয়েছে এমন ব্যক্তি
যে
সকল
ব্যক্তির বার্ষিক আয়
সরকার
নির্ধারিত করমুক্ত আয়ের সীমার বেশি, তাদের
অবশ্যই
আয়কর
রিটার্ন দাখিল
করতে
হবে।
উদাহরণ:
- চাকরিজীবী
- ব্যবসায়ী
- শিল্প মালিক
- ফ্রিল্যান্সার
ও
স্বনিযুক্ত ব্যক্তি
২। নির্দিষ্ট শ্রেণির ব্যক্তি (আয় থাকুক বা না থাকুক)
নিম্নোক্ত ব্যক্তিদের আয়
থাকুক
বা
না
থাকুক
রিটার্ন দাখিল
করা
আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক—
- সংসদ সদস্য
- সিটি করপোরেশন,
পৌরসভা ও
ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও
সদস্য
- প্রথম শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তা
- ডাক্তার, প্রকৌশলী
(ইঞ্জিনিয়ার), আইনজীবী
- চার্টার্ড
অ্যাকাউন্ট্যান্ট ও
কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্ট
- ব্যবসায়ী,
ঠিকাদার ও
সরবরাহকারী
- লাইসেন্সধারী
আগ্নেয়াস্ত্রের মালিক
৩। ব্যবসা ও পেশাজীবী শ্রেণি
নিম্নোক্ত পেশার
ব্যক্তিদের রিটার্ন দাখিল
করতে
হয়—
- একক মালিকানা
ব্যবসায়ী
- অংশীদারি
ব্যবসার অংশীদার
- দোকান বা ট্রেড লাইসেন্সধারী
- আমদানিকারক
ও
রপ্তানিকারক
৪। সম্পদ ও সুবিধাগী ব্যক্তি
যারা
নির্দিষ্ট কিছু
সম্পদ
বা
সুবিধা
ভোগ
করেন,
তাদের
রিটার্ন দিতে
হয়—
- মোটরগাড়ির
মালিক
- ব্যাংক ঋণ গ্রহণকারী
- ক্রেডিট কার্ডধারী
(নির্দিষ্ট সীমার বেশি লেনদেন)
- বাড়িভাড়া
আয়কারী
৫। প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা
নিম্নোক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো বাধ্যতামূলকভাবে আয়কর
রিটার্ন দাখিল
করবে—
- কোম্পানি
(লিমিটেড কোম্পানি)
- ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান
- বীমা কোম্পানি
- এনজিও ও সমবায় সমিতি
- ট্রাস্ট ও ফাউন্ডেশন
৬। অন্যান্য বাধ্যতামূলক ক্ষেত্র
- নতুন ব্যবসা শুরু করলে
- টিআইএনধারী
সকল করদাতা
- কর কর্তৃপক্ষ
কর্তৃক নোটিশপ্রাপ্ত ব্যক্তি
উপসংহার
পরিশেষে বলা
যায়,
আয়কর
রিটার্ন দাখিল
শুধু
কর
পরিশোধের বিষয়
নয়,
বরং
এটি
একজন
নাগরিকের আইনগত ও সামাজিক দায়িত্ব। আয় না
থাকলেও
অনেক
ক্ষেত্রে রিটার্ন দাখিল
বাধ্যতামূলক, যা
কর
ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও
জবাবদিহি নিশ্চিত করে।
(গ) রিটার্ন দাখিলের পদ্ধতি বর্ণনা কর
(গ) রিটার্ন দাখিলের পদ্ধতি বর্ণনা কর
আয়কর রিটার্ন দাখিল হলো করবর্ষে একজন করদাতার সমস্ত আয়, ব্যয়, বিনিয়োগ ও পরিশোধিত করের পূর্ণাঙ্গ হিসাব নির্ধারিত ফরমে কর কর্তৃপক্ষের নিকট উপস্থাপন করার প্রক্রিয়া। বাংলাদেশে বর্তমানে ম্যানুয়াল ও অনলাইন (ই-রিটার্ন)—এই দুই পদ্ধতিতে রিটার্ন দাখিল করা যায়।
নিচে ধাপে ধাপে রিটার্ন দাখিলের পদ্ধতি আলোচনা করা হলো—
১। করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর (TIN) সংগ্রহ
রিটার্ন দাখিলের প্রথম ধাপ হলো করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর বা ই-টিআইএন (e-TIN) সংগ্রহ করা। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নির্ধারিত অনলাইন সিস্টেম থেকে এটি গ্রহণ করতে হয়। TIN ছাড়া রিটার্ন দাখিল করা যায় না।
২। করবর্ষ নির্ধারণ
করদাতা কোন করবর্ষের জন্য রিটার্ন দাখিল করবেন তা নির্ধারণ করতে হয়। সাধারণত একটি করবর্ষে পূর্ববর্তী অর্থবছরের আয় বিবেচনা করা হয়।
৩। আয়ের উৎস শনাক্ত ও তথ্য সংগ্রহ
করবর্ষে করদাতার সকল আয়ের উৎস চিহ্নিত করে তথ্য সংগ্রহ করতে হয়, যেমন—
· চাকরি থেকে প্রাপ্ত বেতন ও ভাতা
· ব্যবসা বা পেশাগত আয়
· বাড়িভাড়া থেকে আয়
· কৃষি আয়
· ব্যাংক সুদ, লভ্যাংশ ও অন্যান্য আয়
৪। মোট আয় নিরূপণ
উপরোক্ত সকল আয় যোগ করে করদাতার মোট আয় নির্ধারণ করা হয়। এই ধাপটি রিটার্নের ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত।
৫। করযোগ্য আয় নির্ধারণ
মোট আয় থেকে আয়কর আইন অনুযায়ী অনুমোদিত—
· ব্যক্তিগত ছাড়
· ব্যয় ও অবচয়
· বিনিয়োগ ভাতা
·
করমুক্ত
আয়
বাদ দিয়ে করযোগ্য
আয়
নির্ধারণ করা হয়।
৬। আয়করের পরিমাণ নির্ধারণ
করযোগ্য আয়ের উপর সরকার নির্ধারিত করহার প্রয়োগ করে করের পরিমাণ হিসাব করা হয়। এক্ষেত্রে প্রগতিশীল করহার অনুসরণ করা হয়।
৭। কর পরিশোধ
যদি হিসাব অনুযায়ী কর প্রদেয় থাকে, তবে নির্ধারিত ব্যাংকে ট্রেজারি চালান এর মাধ্যমে কর পরিশোধ করতে হয়। চালানের কপি রিটার্নের সাথে সংযুক্ত করা আবশ্যক।
৮। আয়কর রিটার্ন ফরম পূরণ
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কর্তৃক নির্ধারিত আয়কর রিটার্ন ফরমে নিচের তথ্যগুলো সঠিকভাবে পূরণ করতে হয়—
· করদাতার ব্যক্তিগত পরিচয় ও TIN
· আয়ের বিস্তারিত বিবরণ
· কর হিসাব
· পরিশোধিত করের তথ্য
· সম্পদ ও দায়ের বিবরণ (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে)
৯। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংযুক্তি
রিটার্নের সাথে সংযুক্ত করতে হয়—
· কর পরিশোধের চালানের কপি
· আয়ের সনদ (বেতন সনদ, ব্যাংক স্টেটমেন্ট ইত্যাদি)
· বিনিয়োগ সংক্রান্ত কাগজপত্র
১০। রিটার্ন দাখিল
সম্পূর্ণ রিটার্ন দাখিল করা যায়—
· সংশ্লিষ্ট কর সার্কেল অফিসে সরাসরি
· ডাকযোগে
· অনলাইনে ই-রিটার্ন সিস্টেমের মাধ্যমে
১১। রিটার্ন গ্রহণ ও প্রাপ্তি স্বীকার
কর কর্তৃপক্ষ রিটার্ন গ্রহণ করে একটি রিসিভিং স্লিপ বা প্রাপ্তি স্বীকারপত্র প্রদান করে। ভবিষ্যতের জন্য করদাতাকে এটি সংরক্ষণ করতে হয়।
উপসংহার
রিটার্ন দাখিলের সঠিক ও নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতি অনুসরণ করলে কর ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয় এবং নাগরিক হিসেবে আইনগত দায়িত্ব পালন করা সম্ভব হয়। একটি উন্নত ও শক্তিশালী অর্থনীতির জন্য নিয়মিত রিটার্ন দাখিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
No comments