(ক) প্রমাণের ভার কী? মামলা প্রমাণের দায়িত্ব এবং সাক্ষ্য উপস্থাপনের দায়িত্বের মধ্যে পার্থক্য দেখাও। প্রমাণের ভার সম্পর্কিত সাধারণ নিয়মাবলী বর্ণনা কর।‘অনুমান করতে পারে’, ‘অনুমান করবে’ এবং ‘চূড়ান্ত প্রমাণ’ উদাহরণসহ ব্যাখ্যা কর। (খ) মামলা প্রমাণের দায়িত্ব কার উপর বর্তায়? কখন অভিযুক্ত ব্যক্তির উপর প্রমাণের দায়িত্ব অর্পিত হয়? (গ) বৈধ সন্তানের চূড়ান্ত প্রমাণ কর।
৫. (ক) প্রমাণের ভার কী? মামলা প্রমাণের দায়িত্ব এবং সাক্ষ্য উপস্থাপনের দায়িত্বের মধ্যে পার্থক্য দেখাও। প্রমাণের ভার সম্পর্কিত সাধারণ নিয়মাবলী বর্ণনা কর।‘অনুমান করতে পারে’, ‘অনুমান করবে’ এবং ‘চূড়ান্ত প্রমাণ’ উদাহরণসহ ব্যাখ্যা কর।
(খ) মামলা
প্রমাণের দায়িত্ব কার উপর বর্তায়? কখন অভিযুক্ত ব্যক্তির উপর প্রমাণের দায়িত্ব অর্পিত হয়?
(গ)
বৈধ সন্তানের চূড়ান্ত প্রমাণ কর।
প্রমাণের ভার (Burden of Proof)
প্রমাণের ভার বলতে বোঝায় মামলার
কোন
পক্ষকে
তার
দাবী
বা
অভিযোগ
প্রমাণ
করার
দায়িত্ব
রয়েছে,
এবং আদালত সেই প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়। যিনি কিছু দাবি করেন, তিনি তার সত্যতা প্রমাণ করতে বাধ্য। এটি মূলত দেওয়ানী
বা
ফৌজদারী
মামলায়
আদালতের
ন্যায্যতা
নিশ্চিত
করার
জন্য
গুরুত্বপূর্ণ।
মামলার প্রমাণের দায়িত্ব এবং
সাক্ষ্য উপস্থাপনের দায়িত্ব এর
মধ্যে
পার্থক্য বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:
|
বৈশিষ্ট্য |
মামলা প্রমাণের দায়িত্ব (Burden of Proof) |
সাক্ষ্য উপস্থাপনের দায়িত্ব (Duty to Produce Evidence) |
|
সংজ্ঞা |
আদালতে কোন
পক্ষকে তার
দাবী
বা
অভিযোগ প্রমাণ করার
দায়িত্ব। |
আদালতে মামলা সমর্থনের জন্য
নিজের বা
প্রাসঙ্গিক তথ্য-সাক্ষ্য উপস্থাপন করার দায়িত্ব। |
|
মূল লক্ষ্য |
আদালতকে বোঝানো যে
দাবী/অভিযোগ সত্য
কিনা। |
আদালতকে প্রয়োজনীয় তথ্য ও প্রমাণ সরবরাহ করা। |
|
প্রয়োগ ক্ষেত্র |
দেওয়ানী ও
ফৌজদারী উভয়
মামলায় প্রযোজ্য। |
প্রায়শই দেওয়ানী মামলা বা
ফৌজদারী মামলার প্রসিকিউশনের ক্ষেত্রে। |
|
প্রমাণের মান |
দেওয়ানী: সম্ভাব্যতা (preponderance of evidence) |
প্রমাণের মান
নয়;
শুধু
সাক্ষ্য বা তথ্য আদালতে উপস্থাপন করা। |
|
উদাহরণ |
ফৌজদারী: রাষ্ট্র প্রমাণ করবে
অভিযুক্ত দোষী। |
অভিযুক্ত বা
বাদী
সাক্ষী হাজির করবে,
দলিল
বা
চিঠিপত্র আদালতে দাখিল করবে। |
প্রমাণের ভার সম্পর্কিত সাধারণ নিয়মাবলী
১. যিনি
দাবি
করেন,
তিনি
প্রমাণ
করবেন
(He who asserts must prove)
কোনো মামলা বা দাবি আদালতে
উপস্থাপন করলে সেই পক্ষকে
তার
দাবী
প্রমাণ
করার
দায়িত্ব
থাকে।উদাহরণ: দেওয়ানী মামলায় বাদী প্রমাণ করবে যে চুক্তি লঙ্ঘিত
হয়েছে।
২. ফৌজদারী
মামলা
– রাষ্ট্রের
প্রমাণের
ভার
(Burden on Prosecution)
ফৌজদারী মামলায় প্রমাণের মূল দায়িত্ব রাষ্ট্রের (প্রসিকিউশন) ওপর থাকে।অভিযুক্তকে দোষী প্রমাণ করতে হবে সন্দেহাতীতভাবে (beyond reasonable doubt)।অভিযুক্ত সাধারণত নির্দোষ (innocent) বলে ধরে নেওয়া হয়, এবং প্রমাণের ভার রাষ্ট্রের।
৩. প্রতিপক্ষের
পক্ষের
দায়িত্ব
(Burden shifts)
নির্দিষ্ট
ক্ষেত্রে প্রমাণের ভার অভিযুক্ত
বা
প্রতিপক্ষের
ওপর
স্থানান্তরিত
হতে
পারে।
উদাহরণ:
o
আত্মরক্ষা
(self-defense) প্রমাণ
করা
o
উদাসীনতা
(alibi) প্রমাণ করা
তখন অভিযুক্তকে নিজের
ডিফেন্স
প্রমাণের
দায়িত্ব
নিতে হয়।
৪. প্রমাণের
মান
(Standard of Proof)
1. দেওয়ানী
মামলা
(Civil case): প্রমাণের
মান = সম্ভাব্যতা
(preponderance of evidence)যেই
পক্ষের প্রমাণ অধিকতর সম্ভাব্য মনে হয়, সেই পক্ষ জয়ী।
2. ফৌজদারী
মামলা
(Criminal case): প্রমাণের
মান সন্দেহাতীতভাবে (beyond
reasonable doubt) অভিযুক্তকে
দোষী প্রমাণ করতে আদালতে কোনো যৌক্তিক সন্দেহ থাকা যাবে না।
৫. দাবী
ও
প্রমাণের
সামঞ্জস্য
(Consistency between Plea and Proof)
দায়িত্বে থাকা পক্ষকে তার দাবী
ও
প্রমাণের
মধ্যে
সামঞ্জস্য
রাখতে
হবে।
যদি দাবি ও প্রমাণের মধ্যে
বিরোধ থাকে, আদালত প্রমাণ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেয়।
৬. পক্ষপাতে
প্রমাণের
ভার
ব্যবহার
করা
যায়
না
আদালত প্রমাণের ভার পক্ষপাত
বা
প্রভাব
বিস্তার
করার
জন্য
ব্যবহার
করে
না।
কেবল দাবী/অভিযোগের
সত্যতা
যাচাই
করতে ব্যবহার হয়।
অনুমান করতে পারে’, ‘অনুমান করবে’ এবং ‘চূড়ান্ত প্রমাণ’ উদাহরণসহ ব্যাখ্যা কর।
ভূমিকা
সাক্ষ্য আইন ও প্রমাণ আইন
অনুযায়ী, আদালত প্রায়ই কিছু বিষয়কে সত্য
ধরে
নিয়ে
মামলা
পরিচালনা
করে। তবে আইন
অনুযায়ী এই “ধরে নেওয়া” বিভিন্ন রকম হতে পারে। প্রধান তিন ধরনের নিয়ম রয়েছে- অনুমান
করতে
পারে,
অনুমান
করবে,
চূড়ান্ত
প্রমাণ
প্রত্যেকটির
বৈশিষ্ট্য ও প্রাসঙ্গিকতা আলাদা।
১. অনুমান করতে পারে (May Presume)
আদালত কোনো
বিষয়
বা
ঘটনা
সত্য
ধরে
নিতে
পারে,
যদি প্রমাণ পাওয়া যায়। এই
অনুমান
প্রতিহত
(rebut) করা
যায়।এটি প্রমাণের একটি সুবিধা, কিন্তু বাধ্যতামূলক নয়।
উদাহরণ:
1. একটি চুক্তি অনুযায়ী টাকা দেওয়া হয়নি। আদালত অনুমান করতে পারে যে ব্যক্তি ঋণ
গ্রহণ করেছে।
2. অভিযুক্ত দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছে বলে আদালত অনুমান করতে পারে যে সে সেখানে
স্থায়ীভাবে বাস করছে।
3.যদি
অভিযুক্ত প্রমাণ দেয় যে টাকা নেওয়া
হয়নি বা অন্য ঠিকানায়
থাকে, তাহলে অনুমান প্রতিহত হবে।
মূল
বৈশিষ্ট্য:
১.বাধ্যতামূলক
নয়
২.
প্রতিহতযোগ্য
২. অনুমান করবে (Shall Presume)
সংজ্ঞা:আদালত আইন অনুযায়ী কোনো
বিষয়কে
সত্য
হিসাবে
ধরে
নেবে,
তবে এটি সীমিতভাবে
প্রতিহতযোগ্য।সাধারণত আইন কোন নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে এটি নির্দেশ করে।
উদাহরণ:
1. সন্তান এবং মাতার সম্পর্ক: সন্তানের জন্ম যদি বৈধভাবে নিবন্ধিত হয়, আদালত অনুমান করবে যে মা ওই
সন্তানের প্রকৃত মা।
2. আইন বলে, বিবাহিত দম্পতির সন্তানকে স্বামীর সন্তান ধরে নেওয়া হবে, যতক্ষণ না উল্টো প্রমাণ
আসে।
মূল
বৈশিষ্ট্য:
১.আইন
অনুযায়ী বাধ্যতামূলক
২.সীমিতভাবে
প্রতিহতযোগ্য
৩. চূড়ান্ত প্রমাণ (Conclusive /
Irrebuttable Evidence)
সংজ্ঞা:
আদালত আইনের
দ্বারা
নির্ধারিত
কোনো
বিষয়কে
সত্য
হিসাবে
গ্রহণ
করবে,
এবং তা প্রতিরোধ
বা
খণ্ডন
করা
যাবে
না।এটি চূড়ান্ত
ও
অপরিবর্তনীয়
প্রমাণ।
উদাহরণ:
1. সরকারি জন্মনিবন্ধন সনদ
2. সরকারের নির্ধারিত মৃত্যু সনদ
কেউ প্রমাণ দিতে পারবে না যে জন্ম
বা মৃত্যু তারিখ ভিন্ন।
মূল
বৈশিষ্ট্য:
১.প্রমাণ অপ্রতিরোধযোগ্য
২.আইন দ্বারা বাধ্যতামূলক সত্য
(খ) মামলা
প্রমাণের দায়িত্ব কার উপর বর্তায়? কখন অভিযুক্ত ব্যক্তির উপর প্রমাণের দায়িত্ব অর্পিত হয়?
১. মামলা প্রমাণের দায়িত্ব (Burden of Proof)
কার উপর বর্তায়?
সংজ্ঞা:
মামলার প্রমাণের দায়িত্ব বলতে বোঝায় মামলার
কোন
পক্ষকে
তার
দাবী
বা
অভিযোগ
প্রমাণ
করার
দায়িত্ব
থাকা,
যাতে আদালত তার দাবীকে গ্রহণ করতে পারে।
নিয়মাবলী:
(ক) দেওয়ানী মামলা (Civil Case)
মামলায় বাদীর
(Plaintiff) ওপর
প্রমাণের
দায়িত্ব
থাকে।অর্থাৎ, যিনি মামলা করেছেন, তিনি আদালতকে দেখাতে হবে যে তার দাবী
সত্য।উদাহরণ: চুক্তি লঙ্ঘনের মামলা → বাদীকে প্রমাণ করতে হবে যে চুক্তি হয়েছে
এবং তা লঙ্ঘিত হয়েছে।
(খ) ফৌজদারী মামলা (Criminal Case)
মামলার মূল প্রমাণের দায়িত্ব রাষ্ট্রের
(প্রসিকিউশন)
ওপর
থাকে।অভিযুক্তকে দোষী
প্রমাণ
করার
দায়িত্ব
রাষ্ট্রের।প্রমাণের মান: সন্দেহাতীতভাবে
(beyond reasonable doubt)।অভিযুক্তকে
স্বাভাবিকভাবে নির্দোষ
(innocent until proven guilty) ধরা
হয়।
২. কখন অভিযুক্তের ওপর প্রমাণের দায়িত্ব অর্পিত হয়?
অভিযুক্ত সাধারণত নির্দোষ ধরা হয়, কিন্তু কিছু
নির্দিষ্ট
পরিস্থিতিতে
আদালত অভিযুক্তের ওপর সীমিত প্রমাণের ভার চাপিয়ে দিতে পারে।
(ক) আত্মরক্ষা (Self-Defense)
যদি অভিযুক্ত দাবি করে যে সে আক্রমণ
থেকে নিজের
বা
অন্যের
আত্মরক্ষা
করেছে, তাকে প্রমাণ করতে হবে যে তার কার্যকলাপ
স্বাভাবিক আত্মরক্ষার মধ্যে ছিল।
(খ) উদাসীনতা / আলিবাই (Alibi)
অভিযুক্ত প্রমাণ করতে পারে যে সে অপরাধ
সংঘটিত স্থলে উপস্থিত ছিল না।উদাহরণ: হত্যার অভিযোগ → অভিযুক্ত প্রমাণ দিতে পারে যে সে অন্য
জায়গায় ছিল।
(গ) বিশেষ ডিফেন্স (Special Defenses)
মানসিক অক্ষমতা (Insanity), শিশু/অপ্রাপ্তবয়স্কের অপরাধ, চাপ বা প্রলোভন (Duress) ইত্যাদি।অভিযুক্তকে এই ধরনের
ডিফেন্স প্রমাণ করার দায়িত্ব থাকে।
(গ)
বৈধ সন্তানের চূড়ান্ত প্রমাণ কী?
১. সংজ্ঞা ও ধারণা
বৈধ
সন্তান
(Legitimate child) বলতে
বোঝায় যে
সন্তান
বৈধভাবে
বিবাহিত
দম্পতির
অন্তঃগর্ভে
জন্মগ্রহণ
করেছে।চূড়ান্ত
প্রমাণ
(Conclusive Evidence) বলতে
বোঝায় আইন
অনুযায়ী
এমন
প্রমাণ
যা
আদালত
অবশ্যই
গ্রহণ
করবে
এবং
তা
প্রতিহত
বা
খণ্ডন
করা
যাবে
না।
সুতরাং, বৈধ সন্তানের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত প্রমাণ হলো এমন প্রমাণ যা সন্তানের বৈধ
জন্মের সত্যতা প্রমাণ করে এবং আইন অনুযায়ী তা অপ্রতিরোধযোগ্য।
২. আইন অনুযায়ী বৈধ সন্তানের চূড়ান্ত প্রমাণ
সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২ এবং সংশ্লিষ্ট প্রমাণ আইন অনুযায়ী:
1. বিবাহ
সনদ
(Marriage Certificate):সন্তানের
জন্মের সময় যদি সন্তানের পিতা-মাতার বিবাহ বৈধভাবে নিবন্ধিত থাকে, তবে সেই বিবাহ সনদ চূড়ান্ত
প্রমাণ
হিসেবে গ্রহণযোগ্য।
2. সন্তান
জন্মনিবন্ধন
সনদ
(Birth Certificate): জন্মনিবন্ধন
সনদে সন্তানের পিতা-মাতার নাম উল্লেখ থাকলে আদালত এটি চূড়ান্ত
প্রমাণ
হিসেবে গণ্য করবে।এর বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ আদালতে গ্রহণযোগ্য নয়।
3. আইন
অনুযায়ী
বৈধ
বিবাহের
সন্তান
:আদালত অনুমান করে যে বিবাহিত
দম্পতির
সন্তান
স্বাভাবিকভাবে
বৈধ।এই অনুমান চূড়ান্ত
এবং
প্রতিহতযোগ্য
নয়।
৪. উপসংহার
বৈধ সন্তানের চূড়ান্ত
প্রমাণ
হলো বিবাহ
সনদ,
জন্মনিবন্ধন
সনদ
এবং
আইন
অনুযায়ী
অনুমানিত
বৈধ
সন্তানত্ব।এটি
অপ্রতিরোধযোগ্য
প্রমাণ,
আদালত এর বিরুদ্ধে কোনো
প্রমাণ গ্রহণ করবে না।সন্তানের বৈধতা নিশ্চিত করা এবং আইনগত
অধিকার
ও
উত্তরাধিকার
সংরক্ষণ
করা।
No comments