Header Ads

Header ADS

(ক) বিবৃতি, স্বীকার এবং স্বীকারোক্তি বলতে কী বুঝ? পুলিশ অফিসারের কাছে প্রদত্ত স্বীকারোক্তি কি গ্রহণযোগ্য? (খ) স্বীকার ও দোষ স্বীকারের মধ্যে পার্থক্য কী? গ) প্রলোভন, ভীতি প্রদর্শন ও প্রতিশ্রুতির ফলে পুলিশ অফিসারের নিকট অপরাধ স্বীকারোক্তির ফলাফল কী?

 

৩. (ক) বিবৃতি, স্বীকার এবং স্বীকারোক্তি বলতে কী বুঝ? পুলিশ অফিসারের কাছে প্রদত্ত স্বীকারোক্তি কি গ্রহণযোগ্য?

() স্বীকার দোষ স্বীকারের মধ্যে পার্থক্য কী?

) প্রলোভন, ভীতি প্রদর্শন প্রতিশ্রুতির ফলে পুলিশ অফিসারের নিকট অপরাধ স্বীকারোক্তির ফলাফল কী?

 

 

ভূমিকা

আদালতে প্রমাণপত্রের মধ্যে বিবৃতি (Statement), স্বীকার (Admission) এবং স্বীকারোক্তি (Confession)এই তিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো প্রত্যেকটি সাক্ষ্য আইনে আলাদা অর্থ বহন করে এবং আদালতে প্রমাণ হিসেবে ভিন্নভাবে প্রয়োগ হয়। এছাড়াও, পুলিশ হেফাজতে দেওয়া স্বীকারোক্তির গ্রহণযোগ্যতা আইনগতভাবে বিশেষভাবে নিয়ন্ত্রিত।

নিচে বিষয়গুলো বিস্তরিত ব্যাখ্যা করা হলো।

 

. বিবৃতি (Statement)

সংজ্ঞা:
বিবৃতি হলো সাক্ষী বা পক্ষের দেওয়া যে কোনো কথ্য বা লিখিত বক্তব্য, যা মামলার ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত। এটি সাক্ষী নিজে প্রত্যক্ষভাবে জানে এমন তথ্য বা ঘটনার বর্ণনা হতে পারে।

প্রকারভেদ:

১.মৌখিক বিবৃতি (Oral Statement)আদালতে সাক্ষী মৌখিকভাবে যা বলেন।

২.লিখিত বিবৃতি (Written Statement)মামলা সম্পর্কিত লিখিত দলিল, নথি বা ফরমে দেওয়া তথ্য।

প্রয়োজন:

বিবৃতি আইনসঙ্গত প্রাসঙ্গিক হতে হবে। এটি আদালতে সরাসরি প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে, যদি প্রাসঙ্গিকতা এবং সত্যতা নিশ্চিত হয়।

উদাহরণ:

১.আমি রাত ১০টার সময় দোকানের সামনে ছিলাম।

২. আমি দেখেছি অভিযুক্ত পকেটে কিছু রেখেছেন।

 

. স্বীকার (Admission)

সংজ্ঞা:
স্বীকার হলো কোনো পক্ষের নিজের পক্ষের বা মামলার বিষয়ে সত্য স্বীকার করা বক্তব্য এটি সাধারণত দেওয়ানী (Civil) মামলার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়।

বৈশিষ্ট্য:

১. এটি সরাসরি প্রমাণ নয়, তবে পক্ষের পক্ষ থেকে দেওয়া সত্য বক্তব্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ।

২. স্বীকার আদালতকে একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে পক্ষের অবস্থান বোঝায় এবং মামলার ফলাফলে প্রভাব ফেলে।

উদাহরণ:

১. চুক্তি লঙ্ঘন মামলায়, বাদী বলেন—“আমি চুক্তি শর্ত মেনে চলিনি।

২. জমি সংক্রান্ত মামলায় পক্ষ স্বীকার করে—“এই জমি সত্যিই আমার পূর্বপুরুষদের ছিল।

প্রয়োগ:

স্বীকার সাধারণত দেওয়ানী মামলায় প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য। এটি সরাসরি মামলার দণ্ডমূলক প্রমাণ নয়, বরং প্রমাণের একটি মাধ্যম

 

. স্বীকারোক্তি (Confession)

সংজ্ঞা:
স্বীকারোক্তি হলো ফৌজদারী মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তি তার অপরাধ স্বীকার করা বক্তব্য

বৈশিষ্ট্য:

১. স্বীকারোক্তি ফৌজদারী মামলায় সরাসরি প্রমাণ হিসেবে ব্যবহারযোগ্য।

২. আদালত স্বীকারোক্তির সত্যতা যাচাই করে, এবং এটি যদি স্বতঃস্ফূর্ত হয়, তবে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য।

৩. স্বীকারোক্তি সকল প্রকার প্রমাণের চেয়ে বেশি প্রভাবশালী হতে পারে, কারণ তা অভিযুক্তের নিজস্ব স্বীকার।

উদাহরণ:

১.চুরি মামলায় অভিযুক্ত বলেন—“আমি রাত ১২টার সময় দোকানটি চুরি করেছি।

২.হত্যার মামলায় অভিযুক্ত স্বীকার করে—“আমি ঘটনা ঘটিয়েছি।

 

পুলিশ অফিসারের কাছে প্রদত্ত স্বীকারোক্তি

আইনগত নিয়ম:

1.      সাধারণ নিয়ম:পুলিশ হেফাজতে দেওয়া স্বীকারোক্তি সাধারণত আদালতে গ্রহণযোগ্য নয়। রণ পুলিশ হেফাজতে স্বীকারোক্তি প্রায়ই জোরপূর্বক বা প্ররোচনার মাধ্যমে নেওয়া হয়।

2.      শর্তসাপেক্ষে গ্রহণযোগ্য:
স্বীকারোক্তি আদালতে গ্রহণযোগ্য হতে পারে যদি

o    এটি স্বতঃস্ফূর্ত (voluntary) হয়।

o    অভিযুক্তকে তার আইনি অধিকার (উদাহরণ: নীরব থাকার অধিকার, আইনজীবী উপস্থিতি ইত্যাদি) দেওয়া হয়েছে।

o    আদালত স্বীকারোক্তির সত্যতা যাচাই করেছে।

3.      প্রমাণের সীমাবদ্ধতা:

পুলিশ হেফাজতের স্বীকারোক্তি সাধারণত একটি সূচক বা প্রাথমিক প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা হয়। এটি সরাসরি অভিযুক্তের বিরুদ্ধে প্রধান প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে না যদি তা স্বতঃস্ফূর্ত না হয়।

উদাহরণ:

১. অভিযুক্ত পুলিশের কাছ থেকে স্বীকারোক্তি দিয়েছে, কিন্তু পরে আদালতে দাবি করেছে এটি জোরপূর্বক বা প্ররোচিত।

২.আদালত যাচাই করবে: স্বীকারোক্তি কি স্বতঃস্ফূর্ত, কি আইনমাফিক হয়েছে।

 

 

() স্বীকার দোষ স্বীকারের মধ্যে পার্থক্য কী?

স্বীকার দোষ স্বীকারের মধ্যে পার্থক্য

ভূমিকা:
সাক্ষ্য আইনেস্বীকার (Admission)” এবংদোষ স্বীকার (Confession)”—দুটি ভিন্ন ধরনের বক্তব্য। এদের মূল পার্থক্য হলো মামলার ধরন, প্রভাব এবং প্রদানকারী।


বৈশিষ্ট্য

স্বীকার (Admission)

দোষ স্বীকার (Confession)

মামলার ধরন

দেওয়ানী (Civil) মামলা

ফৌজদারী (Criminal) মামলা

উদ্দেশ্য

কোনো পক্ষের সত্য স্বীকার করা

অভিযুক্তের অপরাধ স্বীকার করা

প্রমাণের প্রভাব

প্রমাণের সহায়ক

প্রধান প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য

প্রদানকারী

যেকোনো পক্ষ

কেবল অভিযুক্ত ব্যক্তি

পুলিশ হেফাজতে গ্রহণযোগ্যতা

সাধারণত প্রযোজ্য নয়

স্বতঃস্ফূর্ত আইনসম্মত হলে গ্রহণযোগ্য

উদাহরণ

আমি চুক্তি পূরণ করতে পারিনি।

আমি দোকান চুরি করেছি।

উপসংহার: স্বীকার সাধারণভাবে দেওয়ানী মামলার প্রমাণের সহায়ক।দোষ স্বীকার ফৌজদারী মামলায় অভিযুক্তের বিরুদ্ধে সরাসরি প্রমাণ হিসেবে ব্যবহারযোগ্য।

 

) প্রলোভন, ভীতি প্রদর্শন প্রতিশ্রুতির ফলে পুলিশ অফিসারের নিকট অপরাধ স্বীকারোক্তির ফলাফল কী?

ভূমিকা

ফৌজদারী মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রে স্বীকারোক্তি (Confession) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ। তবে স্বীকারোক্তি গ্রহণযোগ্য হতে হলে তা স্বতঃস্ফূর্ত (voluntary) হতে হবে। আইন স্পষ্টভাবে বলে যে, যদি স্বীকারোক্তি প্রলোভন, ভীতি প্রদর্শন বা প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে অর্জিত হয়, তবে তা আদালতে প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য হয় না।

 

পুলিশ অফিসারের নিকট স্বীকারোক্তির ক্ষেত্রে প্রলোভন, ভীতি প্রতিশ্রুতির প্রভাব

. প্রলোভন (Inducement / Temptation) প্রলোভন বলতে বোঝায় অভিযুক্তকে কোনো সুবিধা, উপকার বা পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে স্বীকারোক্তি করানো।

ফলাফল: এই স্বীকারোক্তি আইনসঙ্গত নয়।আদালত এটিকে বাতিল (inadmissible) বলে গণ্য করে। কারণ স্বীকারোক্তি স্বতঃস্ফূর্ত নয়; এটি প্রলোভনের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে।

 

. ভীতি প্রদর্শন (Threat / Fear) ভীতি প্রদর্শন মানে হলো শারীরিক বা মানসিক হুমকি, কষ্ট বা শাস্তির আশঙ্কা দেখিয়ে স্বীকারোক্তি নেওয়া।

ফলাফল: এই স্বীকারোক্তি আদালতে গ্রহণযোগ্য নয়। আইন অনুযায়ী, এমন স্বীকারোক্তি জোরপূর্বক বা প্ররোচনার মাধ্যমে নেওয়া হয়েছে, তাই তা প্রমাণের যোগ্য নয়।

 

. প্রতিশ্রুতি (Promise) প্রতিশ্রুতি বলতে বোঝায় কোনো দণ্ডমুক্তি, হ্রাস বা সুবিধা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে স্বীকার করানো।

ফলাফল: এই স্বীকারোক্তিও বৈধ প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়।কারণ স্বীকারোক্তি দেওয়ার সময় অভিযুক্তের স্বাধীন ইচ্ছা নেই; আদালত এটিকে বাতিল ঘোষণা করে।

 

উদাহরণ:

1.      পুলিশ অভিযুক্তকে বলে, “স্বীকার করলে আমরা তোমাকে মাস জেল থেকে ছাড়িয়ে দেব।” → স্বীকারোক্তি গ্রহণযোগ্য নয়।

2.      পুলিশ ধমক দিয়ে বলে, “স্বীকার না করলে কঠোর শাস্তি হবে।” → স্বীকারোক্তি গ্রহণযোগ্য নয়।

3.      অভিযুক্ত স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলে, “আমি চুরি করেছি।” → স্বীকারোক্তি গ্রহণযোগ্য।

 

উপসংহার

স্বীকারোক্তি গ্রহণযোগ্য হবে কেবল তখনই, যখন তা স্বতঃস্ফূর্ত, জোর, ভীতি বা প্রলোভনবিহীন।যদি স্বীকারোক্তি প্রলোভন, ভীতি বা প্রতিশ্রুতির ফলে হয়তা আদালতে প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়। অভিযুক্তের বিরুদ্ধে দণ্ডমূলক প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যায় না।

No comments

Powered by Blogger.