১। কোনো দলিলের রেজিস্ট্রেশন কেন প্রয়োজন? ১৯০৮ সালের রেজিস্ট্রেশন আইনানুযায়ী কোন দলিলের রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক? বাধ্যতামূলকভাবে রেজিস্ট্রেশনযোগ্য দলিল রেজিস্ট্রেশন না করা হলে তার ফলাফল কী?
ভূমি আইন, রেজিস্ট্রেশন আইন এবং সরকারি দাবি আদায় আইন
রেজিস্ট্রেশন আইন
১। কোনো দলিলের রেজিস্ট্রেশন কেন প্রয়োজন? ১৯০৮ সালের রেজিস্ট্রেশন আইনানুযায়ী কোন
দলিলের রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক? বাধ্যতামূলকভাবে রেজিস্ট্রেশনযোগ্য দলিল রেজিস্ট্রেশন না করা হলে তার ফলাফল কী?
কোনো দলিলের
রেজিস্ট্রেশন কেন
প্রয়োজন
ভূমিকা
দলিল (Deed) হলো
এমন একটি
লিখিত দলিল
যা দ্বারা
সম্পত্তি বা
কোনো আইনগত
অধিকার সৃষ্টি,
হস্তান্তর, পরিবর্তন
বা বিলুপ্ত
করা হয়।
বিশেষত স্থাবর
সম্পত্তির ক্ষেত্রে
দলিলের রেজিস্ট্রেশন
অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রেজিস্ট্রেশন একটি
আইনগত প্রক্রিয়া,
যার মাধ্যমে
দলিল সরকারিভাবে
নথিভুক্ত ও
সংরক্ষিত হয়।
দলিলের
রেজিস্ট্রেশন প্রয়োজনীয়তার
কারণসমূহ
১)
আইনগত স্বীকৃতি
ও কার্যকারিতা
নিশ্চিতকরণ
রেজিস্ট্রেশন
দলিলকে পূর্ণ
আইনগত বৈধতা
প্রদান করে।
অনেক ক্ষেত্রে
(যেমন: বিক্রয়,
উপহার, বন্ধক
ইত্যাদি) রেজিস্ট্রেশন
ছাড়া মালিকানা
আইনগতভাবে সম্পূর্ণ
হস্তান্তর হয়
না। ফলে
রেজিস্ট্রেশন দলিলকে
কার্যকর করে
তোলে।
২)
মালিকানার নিরাপত্তা
ও সুরক্ষা
রেজিস্ট্রিকৃত
দলিল সরকারি
রেকর্ডে সংরক্ষিত
থাকে। এতে
প্রকৃত মালিকের
অধিকার সুরক্ষিত
হয় এবং
ভবিষ্যতে কেউ
মালিকানা নিয়ে
প্রশ্ন তুললে
এটি শক্ত
প্রমাণ হিসেবে
ব্যবহৃত হয়।
৩)
জনসাধারণকে অবহিতকরণ
(Public Notice)
রেজিস্ট্রেশন
একটি প্রকাশ্য
ঘোষণা (Constructive Notice) হিসেবে
কাজ করে।
অর্থাৎ, সম্পত্তি
সংক্রান্ত লেনদেন
সম্পর্কে তৃতীয়
পক্ষ অবগত
হওয়ার সুযোগ
পায়। এতে
একই সম্পত্তি
একাধিক ব্যক্তির
কাছে বিক্রি
করার মতো
প্রতারণা কমে
যায়।
৪)
প্রতারণা ও
জালিয়াতি প্রতিরোধ
রেজিস্ট্রেশন
প্রক্রিয়ায় দলিলের
পক্ষগণ ও
সাক্ষীদের পরিচয়
যাচাই করা
হয়। সাব-রেজিস্ট্রার
অফিসে উপস্থিত
হয়ে স্বাক্ষর
প্রদান করতে
হয়। এতে
ভুয়া দলিল,
জাল স্বাক্ষর
বা প্রতারণার
সম্ভাবনা হ্রাস
পায়।
৫)
স্থায়ী সরকারি
রেকর্ড সংরক্ষণ
রেজিস্ট্রিকৃত
দলিল সরকারিভাবে
সংরক্ষিত থাকে।
মূল দলিল
হারিয়ে গেলে
বা নষ্ট
হলে অফিস
থেকে প্রত্যয়িত
অনুলিপি সংগ্রহ
করা যায়।
এতে তথ্য
দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ
থাকে।
৬)
আদালতে প্রমাণ
হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা
রেজিস্ট্রিকৃত
দলিল আদালতে
অধিক বিশ্বাসযোগ্য
ও গ্রহণযোগ্য
প্রমাণ হিসেবে
বিবেচিত হয়।
কোনো বিরোধ
দেখা দিলে
এটি বিচারকের
কাছে গুরুত্বপূর্ণ
দলিল হিসেবে
গণ্য হয়।
৭)
ভবিষ্যৎ লেনদেনে
সুবিধা
ব্যাংক ঋণ
গ্রহণ, বন্ধক
প্রদান বা
পুনরায় বিক্রয়ের
ক্ষেত্রে রেজিস্ট্রিকৃত
দলিল অপরিহার্য।
আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহ
সাধারণত রেজিস্ট্রিকৃত
দলিল ব্যতীত
ঋণ মঞ্জুর
করে না।
৮)
সম্পত্তি ব্যবস্থায়
স্বচ্ছতা ও
স্থিতিশীলতা
রেজিস্ট্রেশন
সম্পত্তি লেনদেনে
স্বচ্ছতা, আস্থা
ও শৃঙ্খলা
সৃষ্টি করে।
এটি বাজার
ব্যবস্থাকে স্থিতিশীল
ও নিরাপদ
রাখে।
পরিশেষে, দলিলের রেজিস্ট্রেশন
কেবল আনুষ্ঠানিকতা
নয়; এটি
সম্পত্তির অধিকার
সুরক্ষা, প্রতারণা
প্রতিরোধ, জনস্বার্থ
সংরক্ষণ এবং
আইনি নিরাপত্তা
নিশ্চিত করার
একটি মৌলিক
ব্যবস্থা। তাই
আইন যেসব
দলিল রেজিস্ট্রেশন
বাধ্যতামূলক করেছে,
সেগুলোর যথাযথ
রেজিস্ট্রেশন করা
অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
১৯০৮ সালের
রেজিস্ট্রেশন
আইনানুযায়ী
কোন
দলিলের
রেজিস্ট্রেশন
বাধ্যতামূলক?
রেজিস্ট্রেশন আইন, ১৯০৮ প্রণয়নের উদ্দেশ্য হলো স্থাবর সম্পত্তি সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ লেনদেনসমূহ সরকারিভাবে নথিভুক্ত করা, যাতে মালিকানা সুরক্ষিত থাকে এবং প্রতারণা রোধ হয়। আইনটির ধারা ১৭–এ যেসব দলিলের রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক বলা হয়েছে, সেগুলো নিম্নরূপ—
বাধ্যতামূলকভাবে রেজিস্ট্রেশনযোগ্য
দলিলসমূহ
১) স্থাবর সম্পত্তির বিক্রয় দলিল (Sale Deed)
যে দলিলের মাধ্যমে ১০০ টাকার অধিক মূল্যের স্থাবর সম্পত্তির মালিকানা হস্তান্তর করা হয়, তার রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক।
২) উপহার দলিল (Gift Deed)
স্থাবর সম্পত্তি উপহার দেওয়ার ক্ষেত্রে দলিল অবশ্যই রেজিস্ট্রিকৃত হতে হবে। উপহার মৌখিকভাবে বৈধ নয় (স্থাবর সম্পত্তির ক্ষেত্রে)।
৩) বন্ধক দলিল (Mortgage Deed)
স্থাবর সম্পত্তি বন্ধক রাখার ক্ষেত্রে (বিশেষত সাধারণ বন্ধক, শর্তযুক্ত বিক্রয় বন্ধক ইত্যাদি) রেজিস্ট্রেশন আবশ্যক। তবে টাইটেল ডিড জমা রেখে বন্ধক (Equitable Mortgage) কিছু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম।
৪) এক বছরের অধিক মেয়াদের লিজ (Lease
Deed)
স্থাবর সম্পত্তি এক বছরের বেশি সময়ের জন্য ইজারা/লিজ দিলে সেই দলিল রেজিস্ট্রেশনযোগ্য।
৫) স্থাবর সম্পত্তিতে অধিকার সৃষ্টি, ঘোষণা, হস্তান্তর, সীমাবদ্ধ বা বিলুপ্তকারী দলিল
যে দলিলের মাধ্যমে—
·
কোনো অধিকার সৃষ্টি,
·
হস্তান্তর,
·
ঘোষণা,
·
সীমাবদ্ধ বা
·
বিলুপ্ত করা হয়,
এবং যার মূল্য ১০০ টাকার বেশি—সেসব দলিলের রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক।
৬) ভবিষ্যৎ স্বার্থ বা দাবি সংক্রান্ত দলিল (Assignment of Decree/Interest)
স্থাবর সম্পত্তি সংক্রান্ত কোনো ডিক্রি, দাবি বা স্বার্থ অন্যের নিকট হস্তান্তরের দলিল।
৭) আদালতের ডিক্রি বা আদেশ (নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে)
যদি আদালতের ডিক্রি বা আদেশের মাধ্যমে সম্পত্তিতে অধিকার সৃষ্টি বা হস্তান্তর হয় এবং তা আপস-মীমাংসার ভিত্তিতে হয় (এবং মামলার বিষয়বস্তুর বাইরে সম্পত্তি জড়িত থাকে), তবে তা রেজিস্ট্রেশনযোগ্য।
পরিশেষে, ধারা ১৭ অনুযায়ী, যেসব দলিলের মাধ্যমে স্থাবর সম্পত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ অধিকার সৃষ্টি বা হস্তান্তর হয়, সেসব দলিলের রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক। এর উদ্দেশ্য হলো সম্পত্তি সংক্রান্ত লেনদেনে স্বচ্ছতা, আইনগত সুরক্ষা এবং জনস্বার্থ নিশ্চিত করা।
বাধ্যতামূলকভাবে রেজিস্ট্রেশনযোগ্য
দলিল
রেজিস্ট্রেশন
না
করা
হলে
তার
ফলাফল
কী?
Registration
Act, 1908–এর ধারা ৪৯ অনুযায়ী, যে দলিল আইনত বাধ্যতামূলকভাবে
রেজিস্ট্রেশনযোগ্য, তা রেজিস্ট্রেশন না করলে নিম্নোক্ত ফলাফল ঘটে—
১) দলিল দ্বারা কোনো অধিকার সৃষ্টি বা হস্তান্তর কার্যকর হবে না
যদি কোনো স্থাবর সম্পত্তি সংক্রান্ত বিক্রয়, উপহার, বন্ধক বা এক বছরের অধিক মেয়াদের লিজ দলিল রেজিস্ট্রেশন না করা হয়, তবে সেই দলিল দ্বারা আইনগতভাবে মালিকানা বা অধিকার সৃষ্টি, হস্তান্তর, সীমাবদ্ধ বা বিলুপ্ত হবে না।
অর্থাৎ দলিলটি অকার্যকর (ineffective) হয়ে
যাবে।
২) আদালতে প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য হবে না
রেজিস্ট্রেশনযোগ্য দলিল রেজিস্ট্রেশন না করলে তা আদালতে প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য হবে না, যদি তা দ্বারা স্থাবর সম্পত্তির অধিকার প্রমাণ করতে চাওয়া হয়।
৩) তৃতীয় পক্ষের বিরুদ্ধে দাবি করা যাবে না
অরেজিস্ট্রিকৃত দলিলের ভিত্তিতে কোনো তৃতীয় পক্ষের বিরুদ্ধে অধিকার দাবি করা যাবে না। ফলে প্রকৃত মালিকানা আইনি সুরক্ষা পায় না।
৪) সম্পত্তির লেনদেন অনিশ্চিত হয়ে পড়ে
রেজিস্ট্রেশন না থাকলে একই সম্পত্তি নিয়ে একাধিক দাবি উঠতে পারে এবং প্রতারণার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।
৫) সীমিত ব্যতিক্রম (Proviso to Section 49)
তবে আইন একটি সীমিত সুযোগ দিয়েছে—অরেজিস্ট্রিকৃত দলিলকেচুক্তির প্রমাণ হিসেবে
(Specific Performance মামলায়), অথবা পার্শ্ববর্তী/সহায়ক বিষয় (Collateral Purpose) প্রমাণে ব্যবহার করা যেতে পারে। কিন্তু মূল মালিকানা বা অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য তা ব্যবহারযোগ্য নয়।
পরিশেষে, বাধ্যতামূলকভাবে রেজিস্ট্রেশনযোগ্য
দলিল রেজিস্ট্রেশন না করলে তা দ্বারা সম্পত্তির অধিকার কার্যকরভাবে সৃষ্টি বা হস্তান্তর হয় না এবং আদালতে তা গ্রহণযোগ্য হয় না। ফলে দলিলটি আইনগত শক্তি হারায়।
No comments