২। (ক) রেজিস্ট্রেশন আইনের উদ্দেশ্য কী? রেজিস্ট্রেশনের সাথে সাক্ষ্য আইনের সম্পর্ক আলোচনা কর। (খ) স্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তর দলিল কোন জায়গায় নিবন্ধন করতে হবে? যদি কোনো সাব রেজিস্ট্রার তাঁর আঞ্চলিক অধিক্ষেত্রে অবস্থিত নয় এমন সম্পত্তি রেজিস্ট্রি করেন তবে তার ফলাফল কী?
ভূমি আইন, রেজিস্ট্রেশন আইন এবং সরকারি দাবি আদায় আইন
রেজিস্ট্রেশন আইন
২। (ক) রেজিস্ট্রেশন আইনের উদ্দেশ্য কী? রেজিস্ট্রেশনের সাথে সাক্ষ্য আইনের সম্পর্ক আলোচনা কর।
(খ) স্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তর দলিল কোন জায়গায় নিবন্ধন করতে হবে? যদি কোনো সাব রেজিস্ট্রার তাঁর আঞ্চলিক অধিক্ষেত্রে অবস্থিত নয় এমন সম্পত্তি রেজিস্ট্রি করেন তবে তার ফলাফল কী?
রেজিস্ট্রেশন
আইনের উদ্দেশ্য
কী
১)
স্থাবর সম্পত্তি
সংক্রান্ত লেনদেনের
নথিভুক্তকরণ
আইনের প্রধান
উদ্দেশ্য হলো
সম্পত্তির বিক্রয়,
উপহার, বন্ধক,
লিজ ইত্যাদি
গুরুত্বপূর্ণ দলিলসমূহ
সরকারিভাবে রেজিস্ট্রেশন
করা, যাতে
সেগুলো স্থায়ী
রেকর্ডে সংরক্ষিত
থাকে।
২)
মালিকানার নিশ্চয়তা
ও সুরক্ষা
প্রদান
রেজিস্ট্রেশনের
মাধ্যমে প্রকৃত
মালিকের অধিকার
আইনগতভাবে স্বীকৃত
হয় এবং
ভবিষ্যতে কোনো
বিরোধ দেখা
দিলে তা
প্রমাণ করা
সহজ হয়।
৩)
জনসাধারণকে অবহিতকরণ
(Public Notice)
রেজিস্ট্রেশন
একটি প্রকাশ্য
ঘোষণা হিসেবে
কাজ করে।
এতে তৃতীয়
পক্ষ সম্পত্তির
প্রকৃত অবস্থা
সম্পর্কে জানতে
পারে এবং
প্রতারণার ঝুঁকি
কমে।
৪)
জালিয়াতি ও
প্রতারণা প্রতিরোধ:
দলিল রেজিস্ট্রেশনের
সময় দলিলদাতা
ও সাক্ষীদের
পরিচয় যাচাই
করা হয়।
এতে ভুয়া
বা জাল
দলিল তৈরির
সম্ভাবনা হ্রাস
পায়।
৫)
বিরোধ ও
মামলা-মোকদ্দমা
হ্রাস :সরকারি
নথিভুক্ত দলিল
থাকলে সম্পত্তি
নিয়ে বিরোধ
কমে যায়
এবং আদালতে
বিচার প্রক্রিয়া
সহজ হয়।
৬)
প্রমাণের নির্ভরযোগ্যতা
নিশ্চিত করা
রেজিস্ট্রিকৃত
দলিল আদালতে
অধিক গ্রহণযোগ্য
ও বিশ্বাসযোগ্য
প্রমাণ হিসেবে
বিবেচিত হয়।
৭)
সম্পত্তি ব্যবস্থায়
স্বচ্ছতা ও
শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা
রেজিস্ট্রেশন
সম্পত্তি লেনদেনে
আস্থা, স্থিতিশীলতা
ও সুশাসন
নিশ্চিত করে,
যা অর্থনৈতিক
ব্যবস্থার জন্য
গুরুত্বপূর্ণ।
পরিশেষে, রেজিস্ট্রেশন
আইনের মূল
লক্ষ্য হলো
সম্পত্তি সংক্রান্ত
গুরুত্বপূর্ণ দলিলসমূহকে
আইনগত স্বীকৃতি
প্রদান, জনস্বার্থ
রক্ষা, প্রতারণা
প্রতিরোধ এবং
সম্পত্তি ব্যবস্থায়
স্বচ্ছতা ও
নিরাপত্তা নিশ্চিত
করা।
রেজিস্ট্রেশনের সাথে
সাক্ষ্য
আইনের
সম্পর্ক
আলোচনা
কর।
রেজিস্ট্রেশনের সাথে Indian Evidence Act, 1872–এর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। কারণ, রেজিস্ট্রেশন আইন দলিলকে সরকারিভাবে নথিভুক্ত করে, আর সাক্ষ্য আইন নির্ধারণ করে সেই দলিল আদালতে কীভাবে ও কতখানি প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য হবে।
নিচে বিষয়টি বিস্তারিত আলোচনা করা হলো—
১) রেজিস্ট্রিকৃত দলিলের প্রমাণমূল্য
Registration
Act, 1908 অনুযায়ী রেজিস্ট্রিকৃত দলিল সরকারিভাবে সংরক্ষিত থাকে।
সাক্ষ্য আইনের ধারা ৭৪ ও ৭৭ অনুসারে, রেজিস্ট্রি অফিসে সংরক্ষিত দলিল “Public Document” হিসেবে গণ্য হয় এবং তার প্রত্যয়িত অনুলিপি আদালতে প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য।
২) মৌখিক সাক্ষ্যের সীমাবদ্ধতা
(Sections 91–92)
সাক্ষ্য আইনের ধারা ৯১ ও ৯২ অনুযায়ী, কোনো চুক্তি বা সম্পত্তি সংক্রান্ত লেনদেন লিখিত আকারে সম্পাদিত হলে তার শর্ত প্রমাণের জন্য মৌখিক সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়; লিখিত দলিলই প্রধান প্রমাণ।
অতএব, রেজিস্ট্রিকৃত দলিল থাকলে মৌখিক দাবি দ্বারা তা খণ্ডন করা যায় না (কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া)।
৩) দলিলের সত্যতা সম্পর্কে অনুমান (Presumption)
সাক্ষ্য আইনের ধারা ১১৪ অনুযায়ী আদালত স্বাভাবিক ঘটনা ও সরকারি কার্যাবলির সঠিকতা সম্পর্কে অনুমান করতে পারে।
রেজিস্ট্রেশন একটি সরকারি কার্য হওয়ায় আদালত সাধারণত ধরে নেয় যে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে—যদি না বিপরীত প্রমাণ দেওয়া হয়।
৪) সাক্ষ্য হিসেবে উপস্থাপনযোগ্যতা
রেজিস্ট্রিকৃত দলিল আদালতে সরাসরি প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা যায়।
অন্যদিকে, বাধ্যতামূলক রেজিস্ট্রেশনযোগ্য দলিল রেজিস্ট্রেশন না করা হলে তা দ্বারা মালিকানা প্রমাণ করা যায় না (রেজিস্ট্রেশন আইন ধারা ৪৯)।
৫) স্বাক্ষর ও সম্পাদন প্রমাণ (Execution Proof)
সাক্ষ্য আইনের ধারা ৬৭ ও ৬৮ অনুযায়ী দলিলের স্বাক্ষর ও সম্পাদন প্রমাণ করতে হয়।
রেজিস্ট্রেশনের সময় দলিলদাতা নিজে উপস্থিত থেকে স্বাক্ষর করায়, ভবিষ্যতে তার সম্পাদন প্রমাণ করা সহজ হয় এবং সাব-রেজিস্ট্রার বা সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য হয়।
৬) বিরোধ নিষ্পত্তিতে সহায়ক ভূমিকা
রেজিস্ট্রেশন ও সাক্ষ্য আইন একত্রে কাজ করে—রেজিস্ট্রেশন আইন দলিলকে নথিভুক্ত করে,সাক্ষ্য আইন সেই দলিলের প্রমাণমূল্য নির্ধারণ করে। ফলে সম্পত্তি সংক্রান্ত বিরোধে রেজিস্ট্রিকৃত দলিল শক্তিশালী প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
পরিশেষে,
রেজিস্ট্রেশন আইন দলিলকে আইনগত স্বীকৃতি ও নথিভুক্তকরণ নিশ্চিত করে, আর সাক্ষ্য আইন সেই দলিলের প্রমাণমূল্য ও গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণ করে। তাই রেজিস্ট্রেশন ও সাক্ষ্য আইন পরস্পর পরিপূরক; একটির কার্যকারিতা অন্যটির মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়।
(খ) স্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তর দলিল কোন জায়গায় নিবন্ধন করতে হবে? যদি কোনো সাব রেজিস্ট্রার তাঁর আঞ্চলিক অধিক্ষেত্রে অবস্থিত নয় এমন সম্পত্তি রেজিস্ট্রি করেন তবে তার ফলাফল কী?
স্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তর দলিল কোন জায়গায় নিবন্ধন করতে হবে
স্থাবর
সম্পত্তি হস্তান্তর দলিল কোথায় নিবন্ধন করতে হবে—এ বিষয়টি Registration
Act, 1908–এর ধারা ২৮ ও ২৯–এ নির্ধারিত হয়েছে।
১) সাধারণ নিয়ম (ধারা ২৮)
যে স্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তর করা হচ্ছে, সেই সম্পত্তি যে জেলায় অবস্থিত, সেই জেলার সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে দলিল নিবন্ধন করতে হবে।অর্থাৎ—সম্পত্তি যে এলাকার মধ্যে পড়ে,সেই এলাকার অধিক্ষেত্রভুক্ত (jurisdiction) রেজিস্ট্রি অফিসেই নিবন্ধন বাধ্যতামূলক।
উদাহরণ: যদি জমি ঢাকা জেলায় অবস্থিত হয়, তবে ঢাকা জেলার সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রার অফিসেই দলিল নিবন্ধন করতে হবে।
২) সম্পত্তি একাধিক জেলায় অবস্থিত হলে
যদি একই সম্পত্তির অংশ একাধিক জেলায় থাকে, তাহলে—যেকোনো একটি জেলার রেজিস্ট্রি অফিসে নিবন্ধন করা যাবে,তবে শর্ত হলো, সম্পত্তির কোনো অংশ সেই জেলার মধ্যে অবস্থিত থাকতে হবে।
৩) অন্যান্য দলিলের ক্ষেত্রে (ধারা ২৯)
স্থাবর সম্পত্তি ব্যতীত অন্যান্য দলিল সাধারণত দলিল সম্পাদনের স্থান বা পক্ষগণের বাসস্থানের জেলার রেজিস্ট্রি অফিসে নিবন্ধন করা যায়।
কিন্তু স্থাবর সম্পত্তির ক্ষেত্রে মূল নীতি হলো—সম্পত্তির অবস্থানভিত্তিক নিবন্ধন।
পরিশেষে,
স্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তর দলিল অবশ্যই সেই এলাকার সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে নিবন্ধন করতে হবে, যেখানে সম্পত্তিটি অবস্থিত। এটি আইন দ্বারা নির্ধারিত বাধ্যতামূলক বিধান।
যদি কোনো
সাব-রেজিস্ট্রার
তাঁর
আঞ্চলিক
অধিক্ষেত্রে
অবস্থিত
নয়
এমন
সম্পত্তি
রেজিস্ট্রি
করেন
তবে
তার
ফলাফল
কী?
যদি কোনো সাব-রেজিস্ট্রার তাঁর আঞ্চলিক অধিক্ষেত্রে অবস্থিত নয় এমন স্থাবর সম্পত্তি রেজিস্ট্রি করেন, তাহলে ফলাফল Registration Act, 1908–এর ধারা ২৮ ও ৪৯ অনুযায়ী নিম্নরূপ হবে—
১) নিবন্ধন আইনবিরুদ্ধ ও অবৈধ
আইন অনুযায়ী শুধুমাত্র সেই সম্পত্তির অঞ্চলের সাব-রেজিস্ট্রারই নিবন্ধন করতে পারে।অধিক্ষেত্রের বাইরে রেজিস্ট্রি করা হলে সেটি অবৈধ বা invalid
হিসেবে গণ্য হবে।
২) দলিলের কার্যকারিতা হ্রাস পাবে
এ ধরনের নিবন্ধন বৈধ রেজিস্ট্রেশন হিসেবে স্বীকৃত হবে না।ফলে দলিল দ্বারা মালিকানা হস্তান্তর বা অধিকার সৃষ্টির ক্ষমতা আইনগতভাবে কার্যকর হবে না।
৩) আদালতে চ্যালেঞ্জযোগ্য
কোনো পক্ষ যদি বিরোধ সৃষ্টি করে, আদালত এ ধরনের রেজিস্ট্রেশন বাতিল ঘোষণা করতে পারে।অর্থাৎ, দলিলের বৈধতা ও প্রমাণমূল্য আদালতে প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
পরিশেষে.
স্থাবর সম্পত্তি নিবন্ধনের জন্য সম্পত্তি অবস্থিত এলাকার সাব-রেজিস্ট্রার অফিস–এ রেজিস্ট্রি করা বাধ্যতামূলক।অন্যত্র রেজিস্ট্রি করলে তা অবৈধ ও অকার্যকর হবে।আদালতে মালিকানা বা অধিকার প্রমাণে ব্যবহার করা যাবে না।
No comments