(ক) কেন ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত রেগুলেশন গৃহীত হয়েছিল? (খ) চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত সম্পর্কিত আইনগুলো আলোচনা কর। এরূপ ব্যবস্থা প্রবর্তনের উদ্দেশ্য কি ছিল এবং কেন তা বাতিল করা হলো? রেগুলেশনটির দোষ ও গুণ ব্যাখ্যা কর।
৭।
(ক)
কেন
১৭৯৩
সালে
চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত রেগুলেশন গৃহীত
হয়েছিল?
(খ) চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত সম্পর্কিত আইনগুলো আলোচনা
কর।
এরূপ
ব্যবস্থা প্রবর্তনের উদ্দেশ্য কি
ছিল
এবং
কেন
তা
বাতিল
করা
হলো?
রেগুলেশনটির দোষ
ও
গুণ
ব্যাখ্যা কর।
(ক) কেন
১৭৯৩
সালে
চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত রেগুলেশন গৃহীত
হয়েছিল? বি
স্তারিত পয়েন্ট
১৭৯৩
সালে
চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত রেগুলেশন (Permanent Settlement of 1793) গৃহীত
হওয়ার
কারণগুলোকে বিস্তারিতভাবে পয়েন্ট আকারে
বিশ্লেষণ করলে
দেখা
যায়:
১. রাজস্ব আদায়ের নিশ্চয়তা
পূর্বের ব্যবস্থা (মধ্যবর্তী জমিদার
এবং
মৌজদারদের মাধ্যমে কর সংগ্রহ) ছিল
জটিল
এবং
অনিয়মিত।ব্রিটিশ ইস্ট
ইন্ডিয়া কোম্পানি চেয়েছিল স্থায়ী ও পূর্বনির্ধারিত কর নিশ্চিত করতে,
যাতে
রাজস্ব
আয়
ধারাবাহিক হয়।
২. জমিদারদের স্থায়ী মালিকানা প্রদান
জমিদারদের স্থায়ী মালিকানা দিলে
তারা
কর আদায় ও জমির উন্নয়নের জন্য দায়িত্বশীল হবেন।এটি একটি
উচ্চ-স্তরের প্রশাসনিক সহজতা নিশ্চিত করেছিল।
৩. কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি
ধারণা
ছিল,
যদি
জমিদার
স্থায়ীভাবে জমির
মালিক
হন,
তারা
কৃষি উন্নয়নে বিনিয়োগ করবে।বেশি উৎপাদন
→ বেশি
কর
→ কোম্পানির রাজস্ব
বৃদ্ধি।
৪. প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সুবিধা
মধ্যবর্তী স্তরের
জটিলতা
দূর
করার
মাধ্যমে সরল প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি
হয়।জমিদাররা সরাসরি
সরকারের কাছে
কর
জমা
দিতেন,
যা
প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ সহজ
করেছিল।
৫. ব্রিটিশ সরকারের স্থায়ী রাজস্ব নিশ্চিতকরণ
সরকারের লক্ষ্য
ছিল
রাজস্ব স্থায়ী করা এবং অপ্রত্যাশিত হ্রাস এড়ানো।এটি কোম্পানিকে আয়
ও
বাজেট
পরিকল্পনায় স্থিতিশীলতা প্রদান
করেছিল।
পরিশেষে
চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মূল
লক্ষ্য
ছিল
স্থায়ী রাজস্ব ব্যবস্থা গড়ে তোলা, জমিদারদের দায়িত্ব নিশ্চিত করা, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি করা এবং প্রশাসনিক সহজতা নিশ্চিত করা।
(খ) চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত সম্পর্কিত আইনগুলো আলোচনা কর। এরূপ ব্যবস্থা প্রবর্তনের উদ্দেশ্য কি
ছিল এবং কেন তা বাতিল করা
হলো? রেগুলেশনটির দোষ ও গুণ ব্যাখ্যা
কর।
চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত সম্পর্কিত আইনগুলো আলোচনা
চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত (Permanent Settlement), ১৭৯৩ – সম্পর্কিত
আইনসমূহ
চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ছিল
ব্রিটিশ শাসনামলে ভূমি-রাজস্ব ব্যবস্থার একটি
মৌলিক
সংস্কার, যা
গভর্নর-জেনারেল লর্ড কর্নওয়ালিস
১৭৯৩
সালে
প্রবর্তন করেন।
এর
মাধ্যমে বাংলার
জমিদারদের ভূমির
ওপর
স্থায়ী স্বত্ব
স্বীকৃতি দিয়ে
সরকার
নির্দিষ্ট হারে
চিরস্থায়ী রাজস্ব
ধার্য
করে।
নিচে
এ
ব্যবস্থার সাথে
সংশ্লিষ্ট প্রধান
আইন
ও
বিধানগুলো আলোচনা
করা
হলো—
১) দশশালা বন্দোবস্ত (Decennial Settlement), ১৭৮৯–৯০
কর্নওয়ালিসের আগেই
দশ
বছরের
জন্য
অস্থায়ী রাজস্ব
বন্দোবস্ত করা
হয়।
পরে
এটিকেই
১৭৯৩
সালে
স্থায়ী (Permanent) করা হয়।
উদ্দেশ্য: নির্দিষ্ট সময়ের
জন্য
স্থির
রাজস্ব
ধার্য
করে
রাজস্ব
আদায়ে
স্থিতি
আনা।
২) চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের রেগুলেশন, ১৭৯৩
১৭৯৩
সালের
বিভিন্ন রেগুলেশনের মাধ্যমে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত কার্যকর হয়।
মূল বৈশিষ্ট্য:
- জমিদারদের
ভূমির মালিকানা স্বীকৃতি।
- সরকারের নির্ধারিত
রাজস্ব চিরস্থায়ীভাবে স্থিরকরণ।
- নির্ধারিত
সময়ে রাজস্ব না দিলে জমিদারি নিলামে বিক্রির বিধান।
৩) সূর্যাস্ত আইন (Sunset Law)
রাজস্ব
নির্ধারিত তারিখে
(সূর্যাস্তের পূর্বে)
পরিশোধ
না
করলে
জমিদারি নিলামে
তোলার
বিধান
ছিল।
প্রভাব: অনেক পুরনো
জমিদার
দেউলিয়া হয়ে
জমিদারি হারান;
নতুন
জমিদার
শ্রেণির উত্থান
ঘটে।
৪) জমিদার ও প্রজাস্বত্ব সংক্রান্ত বিধান
চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে জমিদারদের স্বত্ব
নিশ্চিত হলেও
প্রজাদের অধিকার
স্পষ্টভাবে সুরক্ষিত ছিল
না।এর
ফলস্বরূপ পরবর্তীতে প্রজাদের অধিকার
রক্ষায় আইন
প্রণীত
হয়,
যেমন—Bengal
Tenancy Act – প্রজাদের ভাড়ার
হার
ও
উচ্ছেদ
সংক্রান্ত অধিকার
নির্ধারণ।
৫) ফলাফলও মূল্যায়ন
সুবিধা:
- সরকারের রাজস্ব আয় স্থিতিশীল
হয়।
- জমিদার শ্রেণি ব্রিটিশ শাসনের সমর্থক হিসেবে গড়ে ওঠে।
অসুবিধা:
- প্রজাদের
উপর অত্যাচার বৃদ্ধি।
- কৃষিক্ষেত্রে
উন্নয়নের পরিবর্তে জমিদারদের ভোগবিলাস বৃদ্ধি।
- গ্রামীণ অর্থনীতিতে
বৈষম্য তীব্রতর হয়।
পরিশেষে
চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ছিল
বাংলার
কৃষি
ও
সামাজিক কাঠামোতে গভীর
প্রভাব
বিস্তারকারী একটি
আইনগত
ব্যবস্থা। এটি
ব্রিটিশ সরকারের রাজস্ব
নিশ্চিত করলেও
কৃষকসমাজের ওপর
দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব
ফেলে
এবং
পরবর্তীকালে প্রজাস্বত্ব রক্ষায় নতুন
আইন
প্রণয়নের পথ
প্রশস্ত করে।
এরূপ
ব্যবস্থা প্রবর্তনের উদ্দেশ্য কি
ছিল
এবং
কেন
তা
বাতিল
করা
হলো?
চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তনের উদ্দেশ্য
১৭৯৩
সালে
লর্ড কর্নওয়ালিস বাংলায় চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চালু
করেন।
এর
প্রধান
উদ্দেশ্যগুলো ছিল—
১) স্থায়ী ও নিশ্চিত রাজস্ব আদায়
ইস্ট
ইন্ডিয়া কোম্পানি নিয়মিত ও
নির্দিষ্ট পরিমাণ
রাজস্ব
পেতে
চেয়েছিল। প্রতি
বছর
দর-কষাকষি বা পরিবর্তনের ঝামেলা
এড়াতে
রাজস্ব
চিরস্থায়ীভাবে স্থির
করা
হয়।
২) অনুগত জমিদার শ্রেণি সৃষ্টি
জমিদারদের ভূমির
স্থায়ী মালিকানা দিয়ে
ব্রিটিশ শাসনের
প্রতি
তাদের
অনুগত
করা
ছিল
একটি
রাজনৈতিক লক্ষ্য।
৩) কৃষি উন্নয়নের আশা
ধারণা
করা
হয়েছিল, জমিদাররা স্থায়ী মালিকানা পেলে
কৃষিক্ষেত্রে বিনিয়োগ করবে
এবং
উৎপাদন
বাড়াবে।
৪) প্রশাসনিক সরলতা
রাজস্ব
ব্যবস্থাকে সহজ
ও
কম
ব্যয়সাপেক্ষ করা—সরকার সরাসরি প্রজাদের সাথে
নয়,
জমিদারদের মাধ্যমে রাজস্ব
আদায়
করবে।
কেন তা বাতিল করা হলো?
চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত সম্পূর্ণভাবে সমগ্র
ব্রিটিশ ভারতে
একযোগে
“বাতিল”
না
হলেও,
বাংলায় জমিদারি প্রথা
শেষ
পর্যন্ত বিলুপ্ত হয়
স্বাধীনতার পর।
বাতিলের প্রধান
কারণগুলো—
১) কৃষকদের শোষণ
প্রজাদের অধিকার
সুরক্ষিত না
থাকায়
অতিরিক্ত খাজনা
ও
উচ্ছেদ
বেড়ে
যায়।
এর
ফলে
কৃষক
অসন্তোষ বৃদ্ধি
পায়।
২) কৃষি উন্নয়নে ব্যর্থতা
জমিদারদের অনেকেই
কৃষিতে
বিনিয়োগ না
করে
ভোগবিলাসে লিপ্ত
হন।
উৎপাদন
কাঙ্ক্ষিত হারে
বাড়েনি।
৩) সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য
গ্রামীণ সমাজে
ধনী-দরিদ্র ব্যবধান বৃদ্ধি
পায়
এবং
ভূমিহীন কৃষকের
সংখ্যা
বাড়ে।
৪) জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রভাব
ভারতে
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সময়
জমিদারি প্রথা
অন্যায় ও
শোষণমূলক হিসেবে
সমালোচিত হয়।
৫) আইনগত বিলুপ্তি
ভারত
বিভাজনের পর—ভারতে বিভিন্ন রাজ্যে
জমিদারি উচ্ছেদ
আইন
প্রণীত
হয়।পূর্ববাংলা (পরে
পূর্ব
পাকিস্তান, বর্তমান বাংলাদেশ)-এ
East Bengal State Acquisition and Tenancy Act এর মাধ্যমে জমিদারি প্রথা
বিলুপ্ত করা
হয়
এবং
ভূমির
মালিকানা রাষ্ট্রের হাতে
ন্যস্ত
হয়।
পরিশেষে
চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের লক্ষ্য
ছিল
রাজস্ব
স্থিতিশীলতা ও
রাজনৈতিক সমর্থন
নিশ্চিত করা।
কিন্তু
কৃষকশোষণ, বৈষম্য
এবং
কৃষি
উন্নয়নে ব্যর্থতার কারণে
এটি
দীর্ঘমেয়াদে অকার্যকর ও
অজনপ্রিয় হয়ে
পড়ে।
স্বাধীনতার পর
সামাজিক ন্যায়
ও
ভূমি
সংস্কারের স্বার্থে এ
ব্যবস্থা বিলুপ্ত করা
হয়।
রেগুলেশনটির দোষ
ও
গুণ
ব্যাখ্যা কর।
চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের রেগুলেশন, ১৭৯৩ – দোষ ও গুণ
১৭৯৩
সালে
লর্ড কর্নওয়ালিস প্রবর্তিত চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের রেগুলেশন বাংলার
ভূমি-রাজস্ব ব্যবস্থায় দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব
ফেলে।
এর
কিছু
ইতিবাচক দিক
থাকলেও
বহু
গুরুতর
ত্রুটিও ছিল।
গুণ (সুবিধা)
১) নির্দিষ্ট ও স্থায়ী রাজস্ব
সরকার
নির্দিষ্ট হারে
স্থায়ী রাজস্ব
পেত।
এতে
কোম্পানির আর্থিক
পরিকল্পনা সহজ
হয়।
২) প্রশাসনিক সরলতা
সরকার
সরাসরি
কৃষকদের কাছ
থেকে
নয়,
জমিদারদের মাধ্যমে রাজস্ব
আদায়
করত।
ফলে
প্রশাসনিক ব্যয়
ও
জটিলতা
কমে।
৩) জমিদারদের উৎসাহ প্রদানের ধারণা
স্থায়ী মালিকানা দেওয়ায় আশা
করা
হয়েছিল যে
জমিদাররা কৃষি
উন্নয়নে বিনিয়োগ করবে।
৪) একটি নতুন ভূমিমালিক শ্রেণির সৃষ্টি
শিক্ষিত ও
সম্পদশালী জমিদার
শ্রেণি
গড়ে
ওঠে,
যারা
পরবর্তীকালে সমাজ
ও
শিক্ষাক্ষেত্রে কিছু
ভূমিকা
রাখে।
দোষ (অসুবিধা)
১) কৃষকদের অধিকার উপেক্ষা
রেগুলেশনে প্রজাদের স্বত্ব
ও
সুরক্ষা নিশ্চিত করা
হয়নি।
ফলে
অতিরিক্ত খাজনা
ও
উচ্ছেদ
বেড়ে
যায়।
২) সূর্যাস্ত আইন ও জমিদারি নিলাম
নির্ধারিত সময়ে
রাজস্ব
না
দিলে
জমিদারি নিলামে
বিক্রির বিধান
ছিল।
এতে
বহু
পুরনো
জমিদার
জমিদারি হারায়
এবং
অস্থিরতা সৃষ্টি
হয়।
৩) কৃষি উন্নয়নে ব্যর্থতা
অনেক
জমিদার
কৃষিতে
বিনিয়োগ না
করে
বিলাসে
লিপ্ত
হন।
ফলে
উৎপাদন
বৃদ্ধির লক্ষ্য
পূরণ
হয়নি।
৪) সামাজিক বৈষম্য বৃদ্ধি
ধনী
জমিদার
ও
দরিদ্র
কৃষকের
মধ্যে
বৈষম্য
তীব্র
হয়।
গ্রামে
শোষণমূলক সম্পর্ক গড়ে
ওঠে।
৫) সরকারের আর্থিক ক্ষতি
রাজস্ব
স্থায়ীভাবে নির্দিষ্ট করায়
ভবিষ্যতে কৃষি
উৎপাদন
ও
আয়
বাড়লেও সরকার
বাড়তি
অংশ
পায়নি।
উপসংহার
চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের রেগুলেশন প্রশাসনিক স্থিতি
ও
রাজস্ব
নিশ্চিত করলেও
কৃষকসমাজের জন্য
তা
ছিল
শোষণমূলক। দীর্ঘমেয়াদে এর
ত্রুটিগুলোই বেশি
প্রকট
হয়ে
ওঠে
এবং
পরবর্তীকালে ভূমি
সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা দেখা
দেয়।
No comments