রাষ্ট্রীয় সমুদ্র কী? রাষ্ট্রীয় সমুদ্রে নির্দোষ অতিক্রম কী ও এর শর্তাবলি কী কী? বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজ কর্তৃক নির্দোষ অতিক্রমের বিধান লঙ্ঘিত হলে উপকূলীয় রাষ্ট্রের অধিকার ও এখতিয়ার কী? বিদেশি যুদ্ধ জাহাজের ক্ষেত্রেও কি একই অধিকার ও এখতিয়ার থাকে?
৫. রাষ্ট্রীয় সমুদ্র কী? রাষ্ট্রীয় সমুদ্রে নির্দোষ অতিক্রম কী ও এর শর্তাবলি কী কী? বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজ কর্তৃক নির্দোষ অতিক্রমের বিধান লঙ্ঘিত হলে উপকূলীয় রাষ্ট্রের অধিকার ও এখতিয়ার কী? বিদেশি যুদ্ধ জাহাজের ক্ষেত্রেও কি একই অধিকার ও এখতিয়ার থাকে?
রাষ্ট্রীয়
সমুদ্র
(Territorial Sea) সংজ্ঞা:
উপকূলীয় রাষ্ট্রের স্বীকৃত সার্বভৌমত্বাধীন সমুদ্রের সেই অংশ, যা উপকূল থেকে সাধারণত ১২ নটিক্যাল মাইল (প্রায় ২২.২ কিমি) পর্যন্ত বিস্তৃত থাকে এবং যেখানে রাষ্ট্র আইন প্রয়োগ ও শাসন চালাতে পারে, অথচ অন্যান্য রাষ্ট্রের জাহাজ নির্দোষভাবে অতিক্রম করতে পারে।
সহজভাবে বলা যায় যে, রাষ্ট্রীয়
সমুদ্র
হলো
রাষ্ট্রের
নিয়ন্ত্রণাধীন
উপকূলবর্তী
সমুদ্র,
যেখানে
রাষ্ট্রের
আইন
প্রয়োগ
থাকে
কিন্তু
অন্যরা
নির্দোষভাবে
যেতে
পারে।
রাষ্ট্রীয় সমুদ্রে নির্দোষ অতিক্রম কী?
সংজ্ঞা:
রাষ্ট্রীয় সমুদ্রে বিদেশি জাহাজের সেই চলাচলকে নির্দোষ অতিক্রম বলা হয়, যা কোনো ক্ষতিকর বা হুমকিসৃষ্টিকারী কার্যক্রম ছাড়া উপকূলীয় রাষ্ট্রের সমুদ্র সীমা অতিক্রম করে।
অর্থাৎ, কোনো বাণিজ্যিক বা যুদ্ধজাহাজ যদি
শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে এবং ক্ষতি না ঘটিয়ে উপকূলীয় রাষ্ট্রের সমুদ্র অতিক্রম করে, তা নির্দোষ অতিক্রম
হিসেবে গণ্য হবে।
রাষ্ট্রীয় সমুদ্রে নির্দোষ অতিক্রমের শর্তাবলি
UNCLOS-1982 অনুযায়ী,
কোনো বিদেশি জাহাজকে রাষ্ট্রীয় সমুদ্র অতিক্রম করতে হলে নিম্নলিখিত শর্ত পূরণ করতে হবে:
- শান্তিপূর্ণ
উদ্দেশ্য (Peaceful Purpose):
জাহাজের কার্যকলাপ ক্ষতি, হুমকি বা আক্রমণ ছাড়া হতে হবে। উদাহরণ: অস্ত্র পরীক্ষা, গুপ্তচরবৃত্তি, বা সামরিক আগ্রাসন করা যাবে না।
- উপকূলীয়
রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব সম্মান করা: রাষ্ট্রের আইন, নিরাপত্তা ও
সম্পদ লঙ্ঘন করা যাবে না। উদাহরণ: সমুদ্র বা উপকূলের সম্পদ অবৈধভাবে ব্যবহার করা যাবে না।
- দ্রুত
বা হঠাৎ নয়, স্বাভাবিক গতিতে অতিক্রম: জাহাজের যাত্রা সামঞ্জস্যপূর্ণ ও ধারাবাহিক হতে হবে।
- উপকূলীয়
রাষ্ট্রের আইন ও বিধি মেনে চলা: বন্দর, নিরাপত্তা ও
পরিবেশ সংক্রান্ত স্থানীয় নিয়ম মেনে চলা।
- নির্দোষ
কার্যক্রমে সীমিত থাকা: অতিক্রম কেবল বাণিজ্যিক, পরিবহন, গবেষণা বা সমুদ্রপথে চলাচলের জন্য। ক্ষতিকর কাজ যেমন দূষণ বা খনন করা যাবে না।
- প্রকৃত
অবস্থায় অতিক্রম (Not altering the nature of the sea)সমুদ্রের
গভীরতা, ভৌগোলিক বা প্রাকৃতিক অবস্থা পরিবর্তন করে চলাচল করা যাবে না।
বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজ কর্তৃক নির্দোষ অতিক্রম লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে উপকূলীয় রাষ্ট্রের অধিকার ও এখতিয়ার
যদি কোনো বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজ রাষ্ট্রীয় সমুদ্রের নির্দোষ অতিক্রমের বিধান লঙ্ঘন করে (যেমন: ক্ষতিকর কার্যক্রম, দূষণ, অস্ত্র পরিবহন), তাহলে উপকূলীয় রাষ্ট্রের অধিকার হলো:
1. জাহাজ আটক বা অবরোধ (Detention / Arrest):
লঙ্ঘনকারী জাহাজকে স্থায়ীভাবে বা সাময়িকভাবে আটক করা যায়।
2. শাস্তি বা জরিমানা (Penal Measures /
Fines): আইন
লঙ্ঘনের জন্য জাহাজ বা মালিককে অর্থনৈতিক শাস্তি আরোপ করা।
3. জাহাজকে সীমানার বাইরে পাঠানো (Expulsion /
Ordering to Leave): নিরাপত্তা
রক্ষার্থে উপকূলীয় কর্তৃপক্ষ জাহাজকে রাষ্ট্রীয় সমুদ্র থেকে চলে যেতে নির্দেশ দিতে পারে।
4. ক্ষতিপূরণ দাবি (Compensation /
Reparations): যদি
জাহাজের কারণে উপকূলীয় সম্পদ বা পরিবেশে ক্ষতি ঘটে, তার জন্য ক্ষতিপূরণ দাবি করা যায়।
5. আইনি ব্যবস্থা (Judicial Action):
জাতীয় আদালত বা আন্তর্জাতিক আইন
অনুযায়ী লঙ্ঘনের জন্য মামলা বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া।
বিদেশি
যুদ্ধ
জাহাজের ক্ষেত্রেও কি
একই
অধিকার
ও
এখতিয়ার থাকে?
বিদেশি যুদ্ধ জাহাজ (Foreign Warship)
হলো অন্য দেশের নৌবাহিনী বা প্রতিরক্ষা বাহিনীর
জাহাজ।
নির্দোষ অতিক্রম (Innocent Passage)-এর ক্ষেত্রে, যুদ্ধ
জাহাজের জন্য বিশেষ নিয়ম প্রযোজ্য, কারণ এগুলো সামরিক ক্ষমতা ও সার্বভৌমত্বের সাথে যুক্ত।
UNCLOS-1982 অনুযায়ী:
যুদ্ধ জাহাজও রাষ্ট্রীয় সমুদ্র অতিক্রম করতে পারে, কিন্তু শর্ত থাকে পূর্ব অনুমতি (Prior Notification
or Authorization) এবং
অতিক্রম নির্দোষ হওয়া উচিত।
না,
বিদেশি যুদ্ধ জাহাজের ক্ষেত্রে উপকূলীয় রাষ্ট্রের অধিকার ও এখতিয়ার বাণিজ্যিক জাহাজের মতো
পুরোপুরি নয়।
নির্দোষ অতিক্রমের প্রেক্ষাপট
বিদেশি যুদ্ধ জাহাজও রাষ্ট্রীয় সমুদ্র
অতিক্রম করতে পারে, কিন্তু সাধারণত: পূর্বে উপকূলীয় রাষ্ট্রের অনুমতি নেওয়া প্রয়োজন (UNCLOS-1982, আর্টিকেল 20)।এটি “নির্দোষ অতিক্রম” ধরণের হতে হবে, অর্থাৎ ক্ষতি বা হুমকি ছাড়া।
লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে পার্থক্য
যদি
বিদেশি
যুদ্ধ
জাহাজ
নির্দোষ অতিক্রমের শর্ত লঙ্ঘন করে,
যেমন:
অস্ত্র
বা
সামরিক
সরঞ্জাম নিয়ে
হুমকি
সৃষ্টি
করা,গুপ্তচরবৃত্তি করা,
পরিবেশ
বা
উপকূল
ক্ষতিগ্রস্ত করা।
তাহলে
উপকূলীয় রাষ্ট্রের অধিকার ও এখতিয়ার বাণিজ্যিক জাহাজের তুলনায় ভিন্ন ও সীমিত।
|
বিষয় |
বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজ |
বিদেশি যুদ্ধ জাহাজ |
|
আটক বা অবরোধ |
রাষ্ট্র পূর্ণভাবে আটক
করতে
পারে |
সীমিত; সাধারণত সরাসরি আটক
না
করে
কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে সমাধান করা
হয় |
|
জরিমানা / শাস্তি |
আইন
লঙ্ঘনের জন্য
আরোপ
করা
যায় |
সাধারণত আরোপ
করা
যায়
না;
কারণ
যুদ্ধজাহাজকে “সার্বভৌমত্ব” নিরাপত্তা রয়েছে |
|
বহিষ্কার / সীমানার বাইরে পাঠানো |
সম্পূর্ণ অধিকার আছে |
করা
সম্ভব, কিন্তু কূটনৈতিক প্রোটোকল মেনে
করতে
হবে |
|
ক্ষতিপূরণ দাবি |
রাষ্ট্র বা
পরিবেশ ক্ষতির ক্ষেত্রে দাবি
করা
যায় |
সীমিত; সাধারণত রাষ্ট্রের সম্মতি বা
সমঝোতার মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হয় |
|
আইনি ব্যবস্থা |
জাতীয় বা
আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে করা
যায় |
সীমিত; যুদ্ধজাহাজের ক্ষেত্রে কূটনৈতিক সমঝোতার গুরুত্ব বেশি |
মূল কারণসমূহ
- সার্বভৌমত্বের
স্বীকৃতি:
যুদ্ধজাহাজ আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী সার্বভৌমতার সুরক্ষায় থাকে। - সামরিক
ও কূটনৈতিক জটিলতা:
সরাসরি আটক বা শাস্তি দিলে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সম্পর্ক খারাপ হতে পারে। - নির্দোষ
অতিক্রমের শর্ত:
যুদ্ধজাহাজের জন্য অতিক্রম শান্তিপূর্ণ ও ক্ষতিকর কার্যক্রমবিহীন হতে হবে।
সহজভাবে বলা যায় যে, যুদ্ধজাহাজের ক্ষেত্রে উপকূলীয় রাষ্ট্রের অধিকার সীমিত ও
No comments