ভোটের জন্মকথা: সময়ের নদী পেরোনো এক গল্প
ভোট
ব্যবস্থা মানবসভ্যতার অন্যতম
শ্রেষ্ঠ অর্জন।
আজ
আমরা
যে
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার কথা
বলি,
যেখানে
জনগণ
নিজের
প্রতিনিধি নির্বাচন করে
রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশগ্রহণ করে—এই ধারণার শিকড়
বিস্তৃত হয়ে
আছে
ইতিহাসের বহু
গভীরে।
ভোট
কেবল
একটি
পদ্ধতি
নয়;
এটি
মানুষের আত্মমর্যাদা, অধিকার
ও
নিজের
ভাগ্য
নিজ
হাতে
গড়ার
সাহসের
প্রতীক। এই
সাহসের
জন্ম
হয়েছিল
বহু
হাজার
বছর
আগে,
সময়ের
কুয়াশায় ঢাকা
এক
নগরে—এথেন্সে।
প্রাচীন এথেন্স ও ভোটের সূচনা
অনেক
অনেক
বছর
আগে,
যখন
পৃথিবী
ছিল
তরুণ
আর
মানুষ
শিখছিল
কীভাবে
একসঙ্গে বাঁচতে
হয়,
তখন
ভূমধ্যসাগরের ধারে
এক
শহর
ছিল—এথেন্স। সময়টা ছিল খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম
শতাব্দী। সেখানে
রাজা
সব
কথা
বলত
না,
রাষ্ট্রের সব
সিদ্ধান্ত একক
কোনো
শাসকের
হাতে
ছিল
না।
একদিন
খোলা
আকাশের
নিচে
শহরের
মাঝখানের চত্বরে
মানুষ
জড়ো
হলো।
কারও
মাথায়
মুকুট
নেই,
কারও
হাতে
তলোয়ার
বা
রাজদণ্ড নেই—শুধু মানুষের কণ্ঠস্বর।
একজন
নাগরিক
হাতে
নিল
ছোট্ট
একটি
পাথর।
সে
জানত,
এই
পাথরটাই তার
কথা।
আইন
হবে
কি
হবে
না,
যুদ্ধ
হবে
কি
হবে
না—সব সিদ্ধান্ত নির্ভর
করবে
এই
পাথরের
ওজনে।
হাত
উঠল,
পাথর
পড়ল
পাত্রে,
আর
ইতিহাসের বুকে
জন্ম
নিল
এক
নতুন
ধারণা—ভোট।
এথেন্সে নাগরিকরা সরাসরি
সভায়
অংশ
নিয়ে
রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ
করত।
এই
ব্যবস্থাকে বলা
হয়
প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র। তবে
এই
গণতন্ত্র ছিল
সীমাবদ্ধ। নারী,
দাস
ও
বিদেশিরা ভোটাধিকার থেকে
বঞ্চিত
ছিল।
ভোট
তখনো
ছিল
একটি
অসম্পূর্ণ স্বপ্ন। কিন্তু
সব
বড়
স্বপ্নের শুরু
হয়
অসম্পূর্ণতা দিয়েই।
এথেন্সের দর্শন ও গণতন্ত্রের প্রথম নিঃশ্বাস
সকালের
রোদে
এথেন্সের চত্বরে
মানুষ
জড়ো
হতো।
কেউ
চিৎকার
করে
বলত,
“এই
আইন
চাই!”
আর
কেউ
বলত,
“না,
এটা
অন্যায়!”
পাথর
ফেলা
হতো
পাত্রে,
হাত
উঠত
আকাশে।
এথেন্স
বিশ্বাস করত—রাষ্ট্র মানে রাজা নয়,
রাষ্ট্র মানে
মানুষ।
এখানেই
ভোটের
প্রথম
নিঃশ্বাস। যদিও
সেই
নিঃশ্বাস সবার
জন্য
ছিল
না,
তবুও
মানবসভ্যতার ইতিহাসে এটি
ছিল
এক
যুগান্তকারী পদক্ষেপ।
রোমান প্রজাতন্ত্র ও প্রতিনিধি গণতন্ত্র
সময়
গড়িয়ে
গেল।
এথেন্সের পর
ইতিহাসের মঞ্চে
উঠে
এলো
রোম।
রোমানরা উপলব্ধি করল
যে,
সবাই
একসঙ্গে সব
সিদ্ধান্ত নিলে
শাসনব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা দেখা
দিতে
পারে।
তারা
বলল,
“কেউ
কেউ
কথা
বলবে
সবার
হয়ে।”
এভাবেই
জন্ম
নিল
প্রতিনিধি গণতন্ত্র।
রোমান
প্রজাতন্ত্রে জনগণ
সরাসরি
সব
সিদ্ধান্ত না
নিয়ে
প্রতিনিধি নির্বাচন করত।
এখান
থেকেই
আধুনিক
প্রতিনিধি গণতন্ত্রের ধারণা
গড়ে
ওঠে।
ভোট
এবার
আর
শুধু
মত
প্রকাশ
নয়—হলো দায়িত্ব ও
বিশ্বাসের প্রতীক।
মধ্যযুগ ও ভোটের অন্ধকার সময়
এরপর
এলো
ইতিহাসের অন্ধকার অধ্যায়। মধ্যযুগে রাজতন্ত্র ও
সামন্ততন্ত্রের প্রভাবে ভোট
ব্যবস্থা দুর্বল
হয়ে
পড়ে।
রাজারা
মুকুট
পরল,
তরবারি
কথা
বলল।
সিংহাসনের ভারে
চাপা
পড়ে
গেল
ভোটের
কণ্ঠস্বর। মনে
হলো,
ভোট
বুঝি
ইতিহাসের পাতায়
হারিয়ে
যাবে।
কিন্তু
ইতিহাস
কখনো
ঘুমায়
না।
ম্যাগনা কার্টা ও অধিকার চেতনার জাগরণ
১২১৫
সালে
ইংল্যান্ডে কিছু
মানুষ
সাহস
করে
বলল,
“রাজাও
আইনের
ঊর্ধ্বে নয়।”
ম্যাগনা কার্টা
নামের
এক
ঐতিহাসিক দলিলে
রাজাকে
আইনের
অধীন
করার
ধারণা
প্রতিষ্ঠিত হলো।
ভোট
তখনও
দুর্বল
ছিল,
কিন্তু
এটি
বেঁচে
রইল—নীরবে, প্রতীক্ষায়।
আলোকিত যুগ ও বিপ্লবের ঢেউ
১৭
ও
১৮
শতকে
ইউরোপে
শুরু
হলো
আলোকিত
যুগ।
দার্শনিকরা কলম
ধরলেন।
জন
লক
বললেন,
“শাসকের
ক্ষমতা
আসে
জনগণ
থেকে।”
রুশো
ঘোষণা
করলেন,
“জনগণই
রাষ্ট্র।” এই
চিন্তাধারা আগুনের
মতো
ছড়িয়ে
পড়ল।
আমেরিকায় মানুষ
চিৎকার
করে
উঠল—আমাদের কথা না
শুনে
কর
নেবে?
চলবে
না!
ফ্রান্সে জনতা
রাজপ্রাসাদের দরজায়
কড়া
নাড়ল।
রাজা
পতিত
হলো,
সংবিধান প্রতিষ্ঠিত হলো।
ভোট
ফিরে
এলো—এবার কাগজে, নিয়মে,
আইনে।
জনগণের
ভোটাধিকার সাংবিধানিক স্বীকৃতি পেল।
সর্বজনীন ভোটাধিকার ও আধুনিক গণতন্ত্র
তবুও
লড়াই
এখানেই
শেষ
হয়নি।
বহুদিন
ধরে
নারী,
শ্রমিক
ও
দরিদ্র
মানুষ
ভোটাধিকার থেকে
বঞ্চিত
ছিল।
তাদের
ভোট
ছিল
মূল্যহীন। কিন্তু
সময়
ধৈর্যশীল।
১৯
ও
২০
শতকে
ধীরে
ধীরে
সর্বজনীন ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠিত হলো।
একদিন
নারীরা
ভোট
পেল।
একদিন
গরিবের
ভোটের
দাম
হলো
ধনীর
সমান।
“এক
ব্যক্তি, এক
ভোট”—এই নীতিটি বাস্তবে রূপ
নিল।
আজ,
যখন
আমরা
ব্যালট
বাক্সে
কাগজ
ফেলি
বা
ইভিএমের বোতাম
চাপি,
তখন
আমরা
শুধু
একটি
সিদ্ধান্ত দিই
না।
আমরা
এথেন্সের সেই
চত্বরে
দাঁড়ানো এক
নাগরিকের কণ্ঠ
বহন
করি,
রোমের
এক
সাধারণ
মানুষের আশা
বহন
করি,
ফরাসি
বিপ্লবীর সাহস
আর
শত
বছরের
সংগ্রামের ইতিহাস
বহন
করি।
ভোট
মানে
শুধু
সিদ্ধান্ত নয়।
ভোট
মানে
ইতিহাসের সঙ্গে
হাত
মেলানো।
প্রাচীন গ্রিস
থেকে
শুরু
হয়ে
দীর্ঘ
সংগ্রামের মধ্য
দিয়ে
আধুনিক
ভোট
ব্যবস্থা গড়ে
উঠেছে—মানুষের হাতে নিজের ভাগ্য
তুলে
দেওয়ার
সাহস
হিসেবে।


No comments