যুদ্ধবন্দী কারা ও তাদের প্রতি কীরূপ আচরণ করতে হবে আলোচনা কর। কোন কোন কার্যগুলো মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ? মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের দায়ে কোনো রাষ্ট্রপ্রধান কি অন্য রাষ্ট্রে দায়মুক্তি দাবি করতে পারে?
৬। যুদ্ধবন্দী কারা ও তাদের প্রতি
কীরূপ আচরণ করতে হবে আলোচনা কর। কোন কোন কার্যগুলো মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ? মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের দায়ে কোনো রাষ্ট্রপ্রধান কি অন্য রাষ্ট্রে
দায়মুক্তি দাবি করতে পারে?
যুদ্ধবন্দী কারা
ও
তাদের
প্রতি
কীরূপ
আচরণ
করতে
হবে
আলোচনা
কর।
যুদ্ধবন্দী কারা? (Who are Prisoners of War – POWs)
সংজ্ঞা (৩য় জেনেভা কনভেনশন, 1949 অনুযায়ী):
যুদ্ধবন্দী হল
সশস্ত্র সংঘাতে অংশ নেওয়া যে কোনো রাষ্ট্রের সেনা বা লড়াকু, যিনি
শত্রু
রাষ্ট্রের হাতে
বন্দী
হন।
বিস্তারিত:
- সেনা
বা মিলিশিয়া সদস্য – যিনি সরাসরি লড়াইয়ে অংশ নেন।
- বিমানচালক
বা নৌযানকর্মী – যারা যুদ্ধকালে ধরা পড়েন।
- সশস্ত্র
বাহিনীর বাহ্যিক সাহায্যকারী – যেমন মেডিকেল বা লজিস্টিক কর্মী, যিনি লড়াইয়ের সরাসরি অংশগ্রহণ করেন।
- গুরুত্বপূর্ণ: সাধারণ বেসামরিক নাগরিক যারা সশস্ত্র কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে না, তাদের POW হিসেবে গণ্য করা হয় না। তবে, তাদের নিরাপত্তা ৪র্থ জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী নিশ্চিত।
যুদ্ধবন্দীর প্রতি আচরণ (Treatment of POWs)
৩য়
জেনেভা
কনভেনশন অনুযায়ী যুদ্ধবন্দীকে মানবিকভাবে আচরণ করতে হবে। এর মূল
বিষয়গুলো হলো:
(ক) মানবিক
আচরণ (Humane Treatment)
হত্যাযজ্ঞ, নির্যাতন, অপমান
বা
যৌন
নিগ্রহ
নিষিদ্ধ।বন্দীর মানবিক
মর্যাদা রক্ষা করা।
(খ) খাদ্য, পানি ও চিকিৎসা
(Provision of Food, Water, Medical Care)
পর্যাপ্ত খাদ্য
ও
পানি
সরবরাহ
বাধ্যতামূলক।অসুস্থ বা
আহত
বন্দীদের পর্যাপ্ত চিকিৎসা ও যত্ন দিতে
হবে।
(গ) আবাসন ও নিরাপত্তা
(Housing & Safety)
বন্দীদের জন্য
নিরাপদ এবং স্বাস্থ্যসম্মত আশ্রয় নিশ্চিত করা।বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা, স্বাস্থ্যকর পরিবেশ
ও
প্রয়োজনীয় স্যানিটেশন বজায়
রাখতে
হবে।
(ঘ) শ্রম ও কাজের শর্ত (Labor
& Work Conditions)
অত্যন্ত কঠোর
বা
বিপজ্জনক কাজ
করা
নিষিদ্ধ।বন্দীকে শুধুমাত্র মানবিকভাবে
গ্রহণযোগ্য কাজ দেওয়া
যায়।শারীরিক ও
মানবিক
নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে
হবে।
(ঙ) যোগাযোগের
অধিকার (Right to Communicate)
পরিবার
বা
আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে
যোগাযোগ করার
অধিকার
থাকবে।উদাহরণ: ICRC-এর মাধ্যমে বার্তা প্রেরণ ও গ্রহণ।
(চ) আইনি অধিকার
(Judicial Rights)
বন্দীর
বিরুদ্ধে কোনো
শাস্তিমূলক ব্যবস্থা আইন ও প্রমাণের ভিত্তিতে নিতে
হবে।ন্যায়সঙ্গত বিচার
এবং
প্রতিকার নিশ্চিত করা
হবে।
৪ মূল লক্ষ্য
যুদ্ধবন্দীর মৌলিক মানবিক অধিকার রক্ষা করা।আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন
ও
জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করা।যুদ্ধকালীন মানবিকতা
বজায় রাখা।
কোন
কোন
কার্যগুলো মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ?
মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের সংজ্ঞা
সংজ্ঞা (ICC, রোম চুক্তি, 2002, ধারা 7):
মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ
হলো
ব্যাপক বা সংগঠিতভাবে বেসামরিক জনগণের বিরুদ্ধে সংঘটিত গুরুতর আক্রমণ, যা
আন্তর্জাতিক আইন
অনুযায়ী দণ্ডনীয়।
মূল বৈশিষ্ট্য:
বেসামরিক জনগণের বিরুদ্ধে সংঘটিত।ব্যাপক বা পরিকল্পিত আক্রমণ হতে
হবে,
না
যে
কোনো
একক
ঘটনার
কারণে।অন্তর্ভুক্ত হিংসাত্মক বা অমানবিক কর্মকাণ্ড।
মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের প্রধান উদাহরণসমূহ
(ক) হত্যাযজ্ঞ
(Murder)
সাধারণ
বা
নির্দিষ্ট বেসামরিক জনগোষ্ঠী হত্যা
করা।উদাহরণ: গণহত্যা বা
হত্যা
অভিযান।
(খ) হত্যার
চেষ্টা বা উত্পীড়ন (Extermination)
কোনো
জনগোষ্ঠীর বড়
অংশকে
শারীরিকভাবে ধ্বংসের চেষ্টা।উদাহরণ: খাবার,
পানি
বা
স্বাস্থ্যসেবা সরবরাহ
না
করা।
(গ) দাসত্ব
বা জোরপূর্বক শ্রম (Enslavement)
মানুষের স্বাধীনতা হরণ
করে
জোরপূর্বক শ্রম
বা
দাসত্বে বাধ্য
করা।
(ঘ) বিতাড়ন
বা জোরপূর্বক স্থানান্তর (Deportation / Forced Transfer)
মানুষের ইচ্ছার
বিপরীতে তাদের আবাস থেকে জোরপূর্বক সরানো।
(ঙ) কারাগারে
নির্যাতন (Imprisonment / Torture)
নির্দিষ্ট বা
বৃহৎ
জনগোষ্ঠীর উপর
শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা।
(চ) যৌন নির্যাতন
(Rape, Sexual Slavery, Forced Prostitution)
গণধর্ষণ, যৌন
দাসত্ব
বা
জোরপূর্বক যৌন
কর্মকাণ্ড।লক্ষ্য: ভয় ও দমন সৃষ্টি করা।
(ছ) অন্যান্য
অমানবিক কর্মকাণ্ড (Other Inhumane Acts)
এমন
কাজ
যা
মানবিক
মর্যাদা লঙ্ঘন
করে।উদাহরণ: হত্যা,
নির্যাতন বা
ধ্বংসের পরিকল্পনা।
বেসামরিক জনগণকে
সুরক্ষা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা।আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক অপরাধ
আইনের
মাধ্যমে দায়ীকে বিচার করা।
মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের দায়ে
কোনো
রাষ্ট্রপ্রধান কি
অন্য
রাষ্ট্রে দায়মুক্তি দাবি
করতে
পারে?
প্রাথমিক ধারণা
মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ (Crimes Against Humanity)
হলো
এমন
গুরুতর
অপরাধ
যা
বেসামরিক জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যাপক বা সংগঠিতভাবে সংঘটিত
হয়।এর
মধ্যে
গণহত্যা, হত্যাযজ্ঞ, নির্যাতন, যৌন
নির্যাতন, জোরপূর্বক বিতাড়ন, দাসত্ব
ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত।
এ
ধরনের
অপরাধের ক্ষেত্রে কোনও ব্যক্তি বা পদমর্যাদা তাকে দায়মুক্তি দেয় না।
রাষ্ট্রপ্রধান ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার দায়মুক্তি
আইনের মূল ভিত্তি:
রোম চুক্তি (Rome Statute of the ICC, 2002), ধারা 27:
“Official capacity as a Head of
State or Government, a member of a Government or Parliament, an elected
representative or a government official shall in no case exempt a person from
criminal responsibility under this Statute.”
বাংলায় অর্থ:
রাষ্ট্রপ্রধান বা
সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, নির্বাচিত প্রতিনিধি বা
সরকারি
কর্মকর্তা কোনও অবস্থাতেই অপরাধের জন্য দায়মুক্তি পাবে না।“Official capacity” বা পদমর্যাদা দায়মুক্তির প্রমাণ নয়।
গুরুত্বপূর্ণ দিক:
- রাষ্ট্রপ্রধান
বা সরকারি পদমর্যাদা অপরাধমুক্তি দেয় না:
অন্য রাষ্ট্রে বা আন্তর্জাতিক আদালতে তারা দায়মুক্তি দাবি করতে পারবে না।
- ICC এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক আদালত ক্ষমতাসম্পন্ন।রাষ্ট্রপ্রধানকে
অভিযুক্ত করে মামলা চলানো যায়।উদাহরণ: সাবেক রাষ্ট্রপ্রধান স্লোবোদান মিলোসেভিচ (সর্বভৃত্তি মামলা), চাদ্রিয়ান যুদ্ধাপরাধ মামলায় অভিযুক্ত।
- ডিপ্লোম্যাটিক
ইমিউনিটি প্রযোজ্য নয়:
রাষ্ট্রপ্রধানের ডিপ্লোম্যাটিক বা রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা তাকে আন্তর্জাতিক অপরাধ থেকে রক্ষা করে না।
উদ্দেশ্য ও নীতি
No one is above the law: কোনো
ব্যক্তি বা
পদমর্যাদা আন্তর্জাতিক অপরাধের বাইরে
নয়।দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করা: রাষ্ট্রপ্রধান বা
উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের ক্ষেত্রে বিচার
থেকে
অমুক্ত
থাকবে
না।রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করা: ক্ষমতায় থাকা
অবস্থায় সংঘটিত
অপরাধের জন্য
দায়ী
করা
সম্ভব।
No comments