আন্তর্জাতিক চুক্তির সংজ্ঞা দাও? “Pacta Sunt Servanda”- নীতিটি ব্যাখ্যা কর। আন্তর্জাতিক চুক্তিতে বিভিন্ন প্রকার শর্ত সংরক্ষণ এবং তাদের ফলাফল আলোচনা কর। ‘‘রেবুস সিক স্ট্যান্টিবুস’’- মতামত ব্যাখ্যা কর। বিস্তারিত ব্যাখ্যা কর
২। আন্তর্জাতিক
চুক্তির সংজ্ঞা দাও? “Pacta Sunt
Servanda”- নীতিটি ব্যাখ্যা কর। আন্তর্জাতিক চুক্তিতে বিভিন্ন প্রকার শর্ত সংরক্ষণ এবং তাদের ফলাফল আলোচনা কর। ‘‘রেবুস সিক স্ট্যান্টিবুস’’- মতামত ব্যাখ্যা কর। বিস্তারিত ব্যাখ্যা কর
আন্তর্জাতিক চুক্তির সংজ্ঞা
আন্তর্জাতিক
চুক্তি
হলো দুই বা ততোধিক সার্বভৌম
রাষ্ট্র
অথবা রাষ্ট্র
ও
আন্তর্জাতিক
সংস্থার মধ্যে সম্পাদিত
এমন একটি আন্তর্জাতিক
সমঝোতা,
যা আন্তর্জাতিক
আইন
দ্বারা
নিয়ন্ত্রিত
এবং যার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে পারস্পরিক
অধিকার
ও
কর্তব্য
সৃষ্টি,
পরিবর্তন
বা
বিলুপ্ত
হয়।
ভিয়েনা কনভেনশন অনুযায়ী সংজ্ঞা
ভিয়েনা
কনভেনশন
অন
দ্য
ল
অব
ট্রিটিজ,
১৯৬৯–এর ২(১)
(ক) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে
রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে সম্পাদিত লিখিত আন্তর্জাতিক চুক্তি, যা আন্তর্জাতিক আইন
দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এবং যার নাম যাই হোক না কেন, তাকেই
আন্তর্জাতিক চুক্তি বলা হয়।
Pacta Sunt Servanda” নীতির
ব্যাখ্যা
নীতির অর্থ : Pacta Sunt Servanda একটি ল্যাটিন
উক্তি। এর অর্থ চুক্তিসমূহ অবশ্যই পালন করতে হবে”।
নীতির সংজ্ঞা
এই নীতি অনুযায়ী, কোনো রাষ্ট্র স্বেচ্ছায় যে আন্তর্জাতিক
চুক্তিতে
সম্মত হয়, সেই চুক্তির সব
শর্ত
ও
বিধান
সৎ
বিশ্বাসে
(Good Faith) পালন
করা তার জন্য আইনগতভাবে
বাধ্যতামূলক।
আইনি ভিত্তি
এই নীতিটি আন্তর্জাতিক আইনের একটি মৌলিক
ও
সর্বজনস্বীকৃত
নীতি।
ভিয়েনা
কনভেনশন
অন
দ্য
ল
অব
ট্রিটিজ,
১৯৬৯–এর ২৬
অনুচ্ছেদে
বলা হয়েছে—
কার্যকর সব চুক্তি পক্ষগুলোর
জন্য বাধ্যতামূলক এবং তা সৎ বিশ্বাসে
পালন করতে হবে।
নীতির মূল উপাদানসমূহ
১. বাধ্যতামূলক চরিত্র
একবার কোনো রাষ্ট্র চুক্তিতে আবদ্ধ হলে সে রাষ্ট্র ইচ্ছামতো
চুক্তি ভঙ্গ করতে পারে না চুক্তি পালন
করা তার আইনগত কর্তব্য
২. সৎ বিশ্বাসে পালন
চুক্তি পালন করতে হবে আন্তরিকভাবে
কৌশল বা অজুহাত দেখিয়ে
দায় এড়িয়ে নয়
৩. অভ্যন্তরীণ আইনের অজুহাত অগ্রহণযোগ্য
কোনো রাষ্ট্র তার অভ্যন্তরীণ আইন বা সংবিধান দেখিয়ে
আন্তর্জাতিক চুক্তি পালন থেকে বিরত থাকতে পারে না।
নীতির গুরুত্ব: আন্তর্জাতিক চুক্তির স্থিতিশীলতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা
নিশ্চিত করে রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে আইনের শাসন বজায়
রাখে ,আন্তর্জাতিক সম্পর্কের শৃঙ্খলা ও আস্থা সৃষ্টি করে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করে
নীতির সীমাবদ্ধতা
যদিও এটি একটি মৌলিক নীতি, তবুও চুক্তি অবৈধ হলেচুক্তি বাতিল বা স্থগিত হওয়ার
বৈধ কারণ থাকলেRebus
Sic Stantibus মতবাদের
মতো ব্যতিক্রম প্রযোজ্য হলে
এই নীতির প্রয়োগ সীমিত হতে পারে।
উপসংহার: Pacta Sunt Servanda নীতি আন্তর্জাতিক
চুক্তি আইনের ভিত্তিস্তম্ভ। এই নীতি ছাড়া
আন্তর্জাতিক চুক্তি ব্যবস্থা কার্যকর ও বিশ্বাসযোগ্য হতো
না। তাই আন্তর্জাতিক আইনে এই নীতির গুরুত্ব
অপরিসীম।
শর্ত সংরক্ষণ (Reservation) কী?
শর্ত
সংরক্ষণ
হলো এমন একটি একতরফা
ঘোষণা,
যা কোনো রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক চুক্তিতে স্বাক্ষর,
অনুসমর্থন,
অনুমোদন
বা
যোগদানের
সময়
করে থাকে, যার মাধ্যমে সে চুক্তির কোনো
নির্দিষ্ট ধারা বা ধারাসমূহের আইনি প্রভাব
সম্পূর্ণ
বা
আংশিকভাবে
বাদ
দিতে
বা
পরিবর্তন
করতে
চায়। এই ধারণাটি
ভিয়েনা
কনভেনশন
অন
দ্য
ল
অব
ট্রিটিজ,
১৯৬৯–এর ২(১)(ঘ) অনুচ্ছেদে স্বীকৃত।
আন্তর্জাতিক চুক্তিতে শর্ত সংরক্ষণের প্রকারভেদ ও ফলাফল
১. অনুমোদিত শর্ত সংরক্ষণ (Permitted
Reservation)
যদি কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তিতে স্পষ্টভাবে বলা থাকে যে শর্ত সংরক্ষণ
করা যাবে, অথবা নির্দিষ্ট কিছু ধারার ক্ষেত্রে শর্ত সংরক্ষণ অনুমোদিত, তাহলে রাষ্ট্র সেই সীমার মধ্যে শর্ত সংরক্ষণ করতে পারে।
ফলাফল
শর্ত সংরক্ষণ আইনগতভাবে
বৈধ
হয় ।সংশ্লিষ্ট ধারা সংরক্ষণকারী রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে কার্যকর হয় না বা পরিবর্তিত
হয় বলে
চুক্তি বহাল থাকে
২. সম্পূর্ণ শর্ত সংরক্ষণ (Total
Reservation)
কোনো রাষ্ট্র যদি চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা বা একাধিক ধারা
সম্পূর্ণভাবে
অগ্রহণযোগ্য
ঘোষণা করে।
ফলাফল
অন্য রাষ্ট্র আপত্তি জানালে চুক্তিগত সম্পর্ক নাও সৃষ্টি হতে পারে। চুক্তির উদ্দেশ্য ব্যাহত হলে শর্ত সংরক্ষণ অবৈধ হতে পারে
৩. আংশিক শর্ত সংরক্ষণ (Partial
Reservation)
যখন কোনো রাষ্ট্র চুক্তির একটি ধারার কিছু অংশ গ্রহণ করেএবং কিছু অংশ বাদ দেয় বা পরিবর্তন করে
ফলাফল
সংশ্লিষ্ট ধারাটি সীমিতভাবে কার্যকর হয় , অন্য রাষ্ট্র আপত্তি না জানালে শর্ত
বৈধ থাকে
৪. আপত্তিহীন শর্ত সংরক্ষণ (Unobjected
Reservation)
যদি অন্যান্য চুক্তিভুক্ত রাষ্ট্র শর্ত সংরক্ষণের বিরুদ্ধে কোনো আপত্তি না তোলে,
ফলাফল
শর্ত সংরক্ষণ কার্যকর হয় এবং সংরক্ষণকারী রাষ্ট্র চুক্তির পূর্ণ পক্ষ হিসেবে গণ্য হয় ও সংশ্লিষ্ট ধারা পরিবর্তিত অবস্থায় প্রযোজ্য হয়
৫. আপত্তিযুক্ত শর্ত সংরক্ষণ (Objected
Reservation)
যখন এক বা একাধিক
রাষ্ট্র কোনো শর্ত সংরক্ষণের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক আপত্তি জানায়
ফলাফল
আপত্তিকারী রাষ্ট্র ও সংরক্ষণকারী রাষ্ট্রের
মধ্যে সংশ্লিষ্ট ধারা কার্যকর নাও হতে পারে বা চুক্তিগত সম্পর্কই সৃষ্টি নাও হতে পারে |
৬. চুক্তির উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যবিরোধী শর্ত
সংরক্ষণ
ভিয়েনা কনভেনশন, ১৯৬৯–এর ১৯
অনুচ্ছেদ
অনুযায়ী কোনো শর্ত সংরক্ষণ যদি চুক্তির উদ্দেশ্য
ও
লক্ষ্য
(Object and Purpose)–এর
পরিপন্থী হয়,
ফলাফল
শর্ত সংরক্ষণ অবৈধ বলে গণ্য হয় তাই সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্র চুক্তির পক্ষ হতে পারে না (বা বিতর্ক সৃষ্টি
হয়)
শর্ত সংরক্ষণের সামগ্রিক ফলাফল
ইতিবাচক দিক: অধিক সংখ্যক রাষ্ট্র চুক্তিতে যোগ দিতে উৎসাহিত হয় ও চুক্তির সার্বজনীনতা বৃদ্ধি পায়
নেতিবাচক দিক: চুক্তির একরূপতা নষ্ট হয় তাই আইনি জটিলতা ও বিরোধ সৃষ্টি
হতে পারে এবং চুক্তির কার্যকারিতা দুর্বল হতে পারে
উপসংহার
শর্ত সংরক্ষণ আন্তর্জাতিক চুক্তিতে রাষ্ট্রসমূহকে নমনীয়
অংশগ্রহণের
সুযোগ
দেয়। তবে শর্ত সংরক্ষণ যদি অতিরিক্ত বা চুক্তির মূল
উদ্দেশ্যবিরোধী হয়, তাহলে তা চুক্তির কার্যকারিতা
ও আন্তর্জাতিক আইনের স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাই শর্ত সংরক্ষণ ব্যবস্থার সুষম প্রয়োগ অপরিহার্য।
রেবুস সিক
স্ট্যান্টিবুস’’- মতামত
ব্যাখ্যা কর।
মতবাদের অর্থ
Rebus Sic Stantibus একটি
ল্যাটিন পরিভাষা। এর
আক্ষরিক অর্থ—
‘‘পরিস্থিতি যেভাবে ছিল, সেভাবেই থাকবে”।
মতবাদের সংজ্ঞা
এই
মতবাদ
অনুযায়ী, কোনো
আন্তর্জাতিক চুক্তি
সম্পাদনের সময়
যে
মৌলিক ও অপরিহার্য পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে চুক্তিটি করা
হয়েছিল, যদি
সেই
পরিস্থিতি পরবর্তীতে অপ্রত্যাশিতভাবে, মৌলিকভাবে এবং সম্পূর্ণরূপে পরিবর্তিত হয়, তবে
সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্র চুক্তিটি বাতিল, স্থগিত বা সংশোধনের দাবি করতে
পারে।
মতবাদের ঐতিহাসিক পটভূমি
এই
মতবাদ
রোমান
আইনে
উৎপত্তি লাভ
করে
পরে
আন্তর্জাতিক প্রথাগত আইনের
অংশ
হিসেবে
স্বীকৃতি পায়
রাষ্ট্রসমূহ দীর্ঘদিন ধরে
এটি
ব্যতিক্রমী নীতি
হিসেবে
প্রয়োগ করে
আসছে
আইনি ভিত্তি
এই
মতবাদ
আন্তর্জাতিক আইনে
সীমিতভাবে স্বীকৃত। ভিয়েনা
কনভেনশন অন দ্য ল অব ট্রিটিজ, ১৯৬৯–এর
৬২ অনুচ্ছেদে এর
বিধান
রয়েছে।
মতবাদ প্রয়োগের শর্তাবলি (ধারা ৬২ অনুযায়ী)
১. পরিস্থিতির পরিবর্তন অবশ্যই মৌলিক হতে হবে :পরিবর্তনটি চুক্তির মূল
ভিত্তিকে সম্পূর্ণভাবে প্রভাবিত করবে
সামান্য পরিবর্তন গ্রহণযোগ্য নয়
২. পরিবর্তনটি অপ্রত্যাশিত হতে হবে : চুক্তি সম্পাদনের সময়
রাষ্ট্রসমূহ এই
পরিবর্তনের কথা
কল্পনাও করেনি
৩. পরিস্থিতি চুক্তির কেন্দ্রীয় ভিত্তি হতে হবে : যে পরিস্থিতির ওপর
চুক্তি
নির্ভর
করেছিল,
সেটিই
বদলে
যেতে
হবে
৪. দায়িত্ব পালনের প্রকৃতি আমূল পরিবর্তিত হতে হবে : চুক্তি পালন
করলে
রাষ্ট্রের ওপর
নতুন
ও
অযৌক্তিক বোঝা
পড়বে
৫. রাষ্ট্র নিজ দোষে পরিবর্তন ঘটাতে পারবে না: রাষ্ট্রের আচরণে
যদি
পরিবর্তন ঘটে,
তবে
এই
মতবাদ
প্রযোজ্য নয়
মতবাদের সীমাবদ্ধতা
১. সীমান্ত চুক্তিতে প্রযোজ্য নয়
ভিয়েনা কনভেনশন স্পষ্টভাবে বলেছ সীমান্ত নির্ধারণ সংক্রান্ত চুক্তিতে এই মতবাদ প্রযোজ্য নয়
২. অপব্যবহারের সম্ভাবনা
রাষ্ট্র ইচ্ছামতো চুক্তি
বাতিলের অজুহাত
হিসেবে
ব্যবহার করতে
পারে
তাই
আন্তর্জাতিক আইন
একে
কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে
Pacta
Sunt Servanda-এর সঙ্গে সম্পর্ক
Pacta Sunt Servanda নীতি
বলে—চুক্তি অবশ্যই পালন
করতে
হবে।
Rebus Sic Stantibus মতবাদ বলে
পরিস্থিতি আমূল
বদলে
গেলে
ব্যতিক্রম সম্ভব অর্থাৎ, এটি
প্রথম
নীতির
একটি
সীমিত ও ব্যতিক্রমধর্মী অব্যাহতি।
মতবাদের ফলাফল
রাষ্ট্র চুক্তি
বাতিল
করতে
পারে
অথবা
চুক্তি
স্থগিত
করতে
পারে
অথবা
নতুন
পরিস্থিতির আলোকে
পুনরায় আলোচনার দাবি
জানাতে
পারে
মতবাদের গুরুত্ব
আন্তর্জাতিক চুক্তিকে বাস্তবতার সঙ্গে
সামঞ্জস্যপূর্ণ করে
রাষ্ট্রকে অসম্ভব
ও
অন্যায্য দায়িত্ব থেকে
রক্ষা
করে
একই
সঙ্গে
চুক্তির স্থায়িত্ব বজায়
রাখে
উপসংহার
‘রেবুস সিক
স্ট্যান্টিবুস’ মতবাদ
আন্তর্জাতিক চুক্তি
আইনে
একটি
গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু
অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে প্রয়োগযোগ্য নীতি। এটি চুক্তির বাধ্যবাধকতা ও
পরিবর্তিত আন্তর্জাতিক বাস্তবতার মধ্যে
ভারসাম্য রক্ষা
করে।
No comments